বছরব্যাপী নানা কমিশনের দাপট; হয়নি শিক্ষা সংস্কার কমিশন 

দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞান এবং কারিগরি বিষয়ে পড়াশুনা করছেন মাত্র ৯ ভাগ শিক্ষার্থী। বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন ৪২ লাখ শিক্ষার্থী। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জানিয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮.২৪ শতাংশ। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই কম আয়ের চাকরিতে নিয়োজিত। নারী এবং গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি।

টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়েবসাইটে ২৩ এপ্রিল প্রকাশ করা র‌্যাঙ্কিংয়ে এশিয়ার ৩৫টি অঞ্চল থেকে মোট ৮৫৩টি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নিয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে করা এই ১৩তম সংস্করণের তালিকায় দেখা গেছে, এশিয়া অঞ্চলের সেরা ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পায়নি।

প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীকে অন্তত ১৭ বছর সময় পার করতে হয়। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই অন্তত ৫-১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় একটি সরকারি চাকরির জন্য। 

দুই বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন ৬২১টি নিচুস্তরের এমএলএসএস পদের বিপরীতে সাক্ষাৎকারের জন্য ১০ হাজার প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে। এই ১০ হাজার প্রার্থীর কমপক্ষে ৮০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট, যদিও এই ১৭তম গ্রেডের পদের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা এসএসসি পাশ। অবাক করা বিষয় হলো, শুধু এক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকমের।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ গঠনে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ সম্পন্ন করেছেন জাতীয় সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে। কিন্তু দেশের টালমাটাল শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঠিক করা জন্য কিংবা সংষ্কারে সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রকার পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

শিক্ষায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে এবং যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত না নেয়ার কারণে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে পড়াশুনা করে লাখ লাখ মানহীন গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে প্রতিবছর। ফলে ছোট একটি চাকরির জন্যও গ্রাজুয়েটদের বসে থাকতে হয় বছরের পর বছর। 

গত এক বছরে শিক্ষার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলো। কিন্তু কোন আলোচনা সমালোচনাই সরকারের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চালাতে এক প্রকার ব্যর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. সি আর আবরারকে শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। 

বছরব্যাপী শিক্ষার সকল অঙ্গনে শিক্ষা সংস্কার কমিশনের আলোচনা এবং দাবি উঠলেও দুজন প্রবীণ অধ্যাপক যারা দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, কথা বলেছেন শিক্ষা এবং অর্থনীতি নিয়ে তারাও কোন পদক্ষেপের সুপারিশ করেননি। 

বিজ্ঞাপন
Dutch Bangla bank Agent Banking

Dutch Bangla bank Agent Banking

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ এক সেমিনারে সরকারকে উচ্চশিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তার আহ্বানে কোন সাড়া আসেনি বছরব্যাপী। তিনি জনকন্ঠকে বলেছেন শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর এখনই সময়। সরকারকে এ বিষয়ে আরো আন্তরিক হতে হবে। বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম চালু করতে হবে। 

জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং এই কমিশনসমূহ স্ব স্ব প্রতিবেদন সরকারের নিকট পেশ করে।

জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে যে ৪৭টি সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত। সংবিধান সম্পর্কিত ধারাগুলো সংস্কারের জন্য সংসদের প্রয়োজন হবে। বাকি যে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে সে সব বিষয়ে নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথাও বলা হয়েছে অঙ্গীকারনামায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জনকন্ঠকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষাকে একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। প্রতি জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে শিক্ষার মান অনেক কমিয়ে দিয়েচে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অনেকগুলো সংস্কার কমিশন হয়েছে। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো শিক্ষা সকল উন্নয়ন এবং জাতি গঠনের হাতিয়ার হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা আজ বঞ্চিত। 

”অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তো ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ তারাই সবচেয়ে ভালো কাজটি করতে পারতো। আশা করছি পরবর্তী সরকার এসে নতুন বছরে শিক্ষাকে নতুন করে সাজাবে। ”

তিনি বলেন, শিক্ষায় সুন্দর পদক্ষেপের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যান। বাংলাদেশ হারায় কোটি কোটি ডলার। সুতরাং শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে গভীরভাবে। 

0%
0%
No Comment Yet