এলপিজি গ্যাসের দামে আগুন— স্থায়ী গ্যাস সংকটে নাভিশ্বাস, বেড়েই চলেছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬ সময়: ০৬:৫৬:০৮
রাজধানীর ডেমরায় এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। কার্যকর নজরদারির অভাবে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। এতে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত দামের বোঝা বইতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর।
সরেজমিনে কোনাপাড়া, ডগাইর, বড় ভাঙ্গা, সারুলিয়া ও ডেমরা বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আই গ্যাস, ফ্রেশ, পেট্রো ম্যাক্স, ইউনিক, ওমেরা, যমুনা, ওরিয়ন, নাভানা, বসুন্ধরা, ইনডেক্স, টোটাল গেজ ও জেএমআইসহ বিভিন্ন কোম্পানির এলপিজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ডেমরা ও আশপাশের এলাকায় পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে প্রায় দুই শতাধিক দোকান থাকলেও সরবরাহ সংকটের কারণে অনেক দোকানে বর্তমানে এলপিজি গ্যাস মিলছে না। ভোক্তারা জানান, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে আগেও অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে হতো কিন্তু এবার মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ভোক্তা পর্যায়ে সাড়ে ৫ কেজি থেকে শুরু করে ৩৫ কেজি পর্যন্ত সিলিন্ডার গ্যাস নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, শীত মৌসুমে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত সরবরাহ দিচ্ছে না। ডেমরার ব্যবসায়ী মো. কমল হাসান বলেন, গত ২ ডিসেম্বরেও তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ১ হাজার ২৫৫ টাকায় বিক্রি করেছেন। এরপর হঠাৎ করেই দাম বাড়তে শুরু করে। গতকাল ছিলো ১ হাজার ৮০০ টাকায়, আজ সেটা বেড়ে ২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ৩৫ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ২০০ টাকার বদলে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ এত কম যে এখন অনেকেই গ্যাস রাখা বন্ধ করে দিয়েছে, বলেন তিনি। তার দাবি, ডিলার পর্যায়ে সিলিন্ডারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
পাইকারি ব্যবসায়ী মো. আনিছ (ছদ্ম নাম) বলেন, এ পরিস্থিতিতে তাদের বিশেষ কিছু করার নেই। কোম্পানি থেকে যে দাম নির্ধারণ করা হয়, সে অনুযায়ীই বাজারে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করতে হয়। পাইকারি পর্যায় থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে আসতে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে দাম কিছুটা বেড়েছে।
এদিকে ডেমরায় দীর্ঘদিনের স্থায়ী পাইপলাইন গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাসিক বিল নিয়মিত পরিশোধ করলেও দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। কোথাও ভোরে, কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও তা রান্নার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
সারুলিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. সিরাজ বলেন, লাইনে গ্যাস ব্যবহার করতে না পারলেও তিতাসকে মাসে ১ হাজার ৮০ টাকা বিল দিতে হচ্ছে। আবার সিলিন্ডার কিনে রান্না করতে গিয়ে মাসে গ্যাস বাবদ খরচ তিন হাজার টাকার বেশি হয়ে যাচ্ছে। এই অরাজকতার শেষ কোথায়?
কোনাপাড়ার বাসিন্দা রাহেলা বেগম বলেন, ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার টাকায় কিনেছি। আগে কিছু কোম্পানি তুলনামূলক কম দামে দিত। এখন সবাই একই দাম রাখছে। অনেক দোকানে আবার গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৪৫০ টাকা। পরে ধাপে ধাপে কমে নভেম্বর মাসে দাঁড়ায় ১ হাজার ২১৫ টাকায়। সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২৫৩ টাকা। তবে ২ ডিসেম্বরের পর থেকেই খুচরা বাজারে দাম বাড়তে শুরু করে। ভোক্তাদের অভিযোগ, একটি অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, আর কার্যকর নজরদারি না থাকায় কালোবাজারিরা নির্বিঘ্নে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে আবাসিক ও শিল্প উভয় খাতেই।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দপ্তরের ব্যবস্থাপক পুলক চাকমা বলেন, গ্যাস সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ চলছে। তবে তিতাসের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত পুরোনো ও বিস্তৃত। ১৯৬৬ সাল থেকে স্থাপিত অনেক পাইপলাইন এখন ৫৫ থেকে ৫৭ বছরের পুরোনো ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের সময়ও অনেক পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব লিকেজ শনাক্ত করে মেরামতের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) সদস্য মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি আইনত অপরাধ। এ ধরনের অভিযোগ কমিশনের কাছে এসেছে। প্রতি মাসেই এলপিজির দাম সমন্বয় করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী রবিবার কমিশনের সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
No Comment Yet