ট্রাম্পের শুল্ক বোমা: ভারত মার্কিন বাণিজ্য কি মুখ থুবড়ে পড়বে?
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬ সময়: ০৫:১৪:৫৪
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করে—এমন দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিল ভারত–মার্কিন সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’ নামে পরিচিত এই বিলটি অনুমোদন পেলেও এখনো কংগ্রেসে ভোটাভুটি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিলটি পাস হলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, যাতে তারা রাশিয়া থেকে স্বল্পমূল্যের তেল কেনা বন্ধ করে। এদিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন না করায় চুক্তিটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, তাকে থামাতে পারে কেবল তার ‘নিজস্ব নীতি ও নিজের মন’। তার ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে ভারতে প্রশ্ন উঠছে—মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার কি আদৌ কোনো সীমা আছে? এই বিল পাস হলে ভারতের অর্থনীতি ও বাণিজ্যে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
গত বছরের আগস্টে ট্রাম্প শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিলে ভারত পাল্টা যুক্তি দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেরাও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত রাশিয়া থেকে বড় অঙ্কে তেল আমদানি করে আসছে। তবে মার্কিন চাপের পর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতকে হয় রাশিয়ার তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, নয়তো ৫০০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে এবং প্রায় ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তার মতে, বিলটি কংগ্রেসে পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও ভারতের উচিত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়া থেকে তেল কিনবে কি না—সে বিষয়ে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে তেল আমদানি কমানো ও শুল্কের ক্ষতি সামলানো একসঙ্গে সম্ভব নয়।
ভারতের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ক্রেতা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে তারা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল পাওয়ার আশা করছে না। রয়টার্স জানায়, এর ফলে চলতি মাসে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক ভারত ইউক্রেন যুদ্ধের পর সমুদ্রপথে রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। কম দামে তেল কিনে ভারত লাভবান হলেও, আমদানি কমে গেলে দেশটির অর্থনীতি ও বৈশ্বিক তেলের বাজারে চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
Shwapno Super Shop
দ্য ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই বিলটির মূল লক্ষ্য ভারত, যেখানে চীন অনেকাংশে নিরাপদ থাকবে। এখন পর্যন্ত কেবল ভারতের ওপরই রাশিয়ান তেল ইস্যুতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, চীনের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এদিকে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর পাঁচ বছর ধরে থাকা সরকারি টেন্ডারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ২০২০ সালে গালওয়ান সংঘর্ষের পর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল কংগ্রেস সরকারকে তীব্র সমালোচনা করেছে।
৫০০ শতাংশ শুল্ক বিলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ভারত-নেতৃত্বাধীন ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও নিজেকে প্রত্যাহার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের কৌশলেরই অংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিল পাস হলেও প্রেসিডেন্টকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু সুবিধা পেতে পারে এবং ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানি কেনা চালিয়ে যেতে পারে। ফলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে ভারতের ওপরই।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের মতে, ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার পরিমাণ বর্তমানে বছরে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সাবেক বাণিজ্য সচিব অজয় দুয়া বলেন, এটি বাণিজ্যকে কার্যত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের শামিল। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে নেওয়া জরুরি।
No Comment Yet