গাজায় ৯৫ হাজার শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে ॥ জাতিসংঘ

গাজা উপত্যকায় শিশুর অপুষ্টি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বর্তমানে ৯৫ হাজার শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে বলে দাবি করেছে জাতিসংঘ। শীতকালীন আবহাওয়া মানবিক সহায়তায় যে সামান্য অগ্রগতি হয়েছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে নতুন বিপদ হিসেবে তীব্র শীত, প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত আট ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্দশা আরও তীব্র হয়েছে।

এদিকে ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস পুলিশের ফৌজদারি ইউনিটের প্রধান মাহমুদ আল আস্তালকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ইসরাইল সমর্থিত একটি ফিলিস্তিনি মিলিশিয়া গোষ্ঠী এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। ঘটনার জন্য হামাস ইসরাইলের সহযোগীদের দায়ী করেছে। খবর আলজাজিরার।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক বলেছেন, মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) তথ্য অনুযায়ী, গাজা উপত্যকার মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ভয়াবহ। কঠোর আবহাওয়া পরিস্থিতি মানবিক সহায়তার অগ্রগতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দুজারিক আরও জানিয়েছেন, পুষ্টি খাতে কাজ করা জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে বিপুলসংখ্যক শিশুকে জরুরি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে শনাক্ত করছে। গত মাসে আমাদের অংশীদাররা ৭৬ হাজারের বেশি শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৯০০টি তীব্র অপুষ্টির ঘটনা শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ৮২০টিরও বেশি ছিল গুরুতর তীব্র অপুষ্টির ঘটনা।

তিনি আরও যোগ করেছেন, এর ফলে ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া তীব্র অপুষ্টির মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজারে। দুজারিক আরও বলেছেন, জাতিসংঘের অংশীদাররা ২৮ হাজার পরিবারের মধ্যে তাঁবু, ত্রিপল ও কম্বলসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বৃষ্টিঝড় অব্যাহত থাকায় এখনো ১১ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন, কারণ অনেক আশ্রয়স্থল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাঁবু কেবল সাময়িক সমাধান। 
জরুরি অবস্থা থেকে প্রাথমিক পুনরুদ্ধারের দিকে যেতে হলে আরও সরঞ্জাম প্রয়োজন। যেমন- টুলকিট, সিমেন্ট, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের জন্য ভারি যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজন টেকসই অর্থায়ন। কঠোর আবহাওয়ার প্রভাব শিশুদের ওপর কতটা ভয়াবহ, সে বিষয়ে আলোকপাত করে দুজারিক বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এবং বছরের শেষ পর্যন্ত আমাদের অংশীদাররা শীতকালীন সহায়তার অংশ হিসেবে ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি শিশুকে শীতের পোশাক এবং ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি জোড়া জুতা বিতরণ করতে পেরেছে।

শিশুদের জন্য নিরাপদ ও বন্ধুসুলভ পরিবেশ তৈরিতে গাজাজুড়ে ১৫০টি বিশেষায়িত তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে দুজারিক বলেছেন, জাতিসংঘের শিক্ষা অংশীদাররা ৩৫ হাজার গাজাবাসী শিক্ষার্থীর জন্য আরও ১৮টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেছে। এ নিয়ে বর্তমানে চালু অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪০টি, যেখানে প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার শিশু পড়াশোনা করছে। 
গাজায় ইসরাইলের চলমান ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে দুজারিক বলেছেন, আমরা চাই গাজায় যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তার ধ্বংস বন্ধ হোক। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে যাক, যাতে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা যায়। এদিকে গাজার সিভিল ডিফেন্সের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে একটি এক বছর বয়সী শিশু দেইর আল বালাহর আল আকসা শহীদ হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁবুতে মারা যায়। ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার মঙ্গলবার বলেছেন, এই শীতকালে এখন পর্যন্ত ছয়জন শিশু হাইপোথার্মিয়ায় (শরীরের অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগায়) মারা গেছে।

বিজ্ঞাপন

Shwapno Super Shop

অন্যদিকে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনধসে পড়ায় আরও চারজন নিহত হয়েছেন। গাজা সিটির রেমাল এলাকায় আল শিফা হাসপাতালের কর্মকর্তা ও সিভিল ডিফেন্স সূত্র জানায়, একটি ভবনধসে পড়লে তিনজন নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন ১৫ বছরের কিশোরী মেয়ে। আরেকটি পৃথক ঘটনায় গাজা সিটিতে আরও একজনের মৃত্যু হয়। সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল সতর্ক করে বলেছেন, এই ঝড় গাজার জনগণের জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। যুদ্ধের কারণে অধিকাংশ মানুষ পর্যাপ্ত আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে এবং ইসরাইলের অব্যাহত নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রয়োজনীয় আশ্রয় সামগ্রী, তাঁবু ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রবেশ করতে পারছে না। এদিকে লন্ডনভিত্তিক ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের অনশনরত বন্দিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা লেখক ও গবেষকেরা।

এতে অনশনরতদের দীর্ঘদিন ধরে বিনাবিচারে আটক রাখার বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের ওপর চাপ আরও জোরালো হলো। নাওমি ক্লেইন, স্যালি রুনি, অ্যাঞ্জেলা ডেভিস, জুডিথ বাটলার ও জর্জ মনবিওটসহ খ্যাতনামা লেখকদের স্বাক্ষরিত ঘোষণায় বলা হয়, আমরা যেকোনো মূল্যে অনশনরত অ্যাক্টিভিস্টদের পাশে আছি। তাদের স্বাস্থ্য দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের সাহস ন্যায়বিচারের জরুরি প্রয়োজনকে সামনে এনে দিচ্ছে। ন্যায্য বিচার ও স্বীকৃতির জন্য তাদের দাবি উপেক্ষা করা যায় না। 
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সরাসরি আন্দোলনকারী সংগঠন, যা ইসরাইলি অস্ত্র প্রস্তুতকারক এলবিট সিস্টেমসের কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে সক্রিয়। সংগঠনটির কর্মীরা এলবিটের যুক্তরাজ্য শাখা ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে প্রতিবাদী অভিযান চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে চুরি ও সহিংস বিশৃঙ্খলার অভিযোগ আনে, যা কর্মীরা অস্বীকার করেছেন। ২০২৩ সাল থেকে আটজন কর্মী বিচার ছাড়াই আটক রয়েছেন, যা যুক্তরাজ্যের ছয় মাসের প্রাক-বিচার আটকসীমা ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ এই আটকাদেশ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দমনপীড়নের অভিযোগ উসকে দিয়েছে।

0%
0%
No Comment Yet