সন্তান যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত

একটি সন্তানের আগমন শুধু একটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ায় না, বরং একটি ঘরে নিয়ে আসে নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা এবং অফুরন্ত ভালোবাসা। মা-বাবার জীবনে সন্তানের হাসি যেমন আনন্দের উৎস, তেমনি তাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলাও একটি মহান দায়িত্ব। ইসলাম সন্তানকে কেবল পারিবারিক সুখের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; বরং তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ, রাষ্ট্র ও উম্মাহর নেতৃত্ব দেবে। তাই সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি সফলতার জন্য নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও ইসলামের আদর্শে গড়ে তোলার দায়িত্বও মা-বাবার ওপর অর্পিত। একজন আদর্শ সন্তান গড়ে ওঠে তখনই, যখন তার অধিকারগুলো যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয় এবং তাকে সঠিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের আলোয় বড় করা হয়।

সন্তান: আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত

পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো সন্তান। সন্তানের চেয়ে বড় আনন্দ একজন মা-বাবার জীবনে আর কিছু হতে পারে না। শৈশবে সন্তান মা-বাবার চোখের শীতলতা, বার্ধক্যে বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং মৃত্যুর পর কবর জীবনে নেক আমল পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন—

الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا

‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা।’ (সুরা আল-কাহফ: আয়াত ৪৬)

সন্তানের এই নেয়ামত উপভোগ করার পাশাপাশি তাদের প্রতি মা-বাবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্যও রয়েছে। আজ যারা শিশু, আগামী দিনে তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রের হাল ধরবে। তাই সন্তানের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করার আগে তাদের প্রাপ্য অধিকারগুলো নিশ্চিত করা মা-বাবার প্রধান দায়িত্ব। সন্তানকে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি ছাড়াই ইসলামের আলোয় বড় করে তোলা এবং আল্লাহর ইবাদতের শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা আত-তাহরিম: আয়াত ৬)

আদর্শ মা নির্বাচন

ইসলাম জীবনের প্রতিটি ধাপের অধিকার নিশ্চিত করেছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুশৃঙ্খলভাবে। একজন পুরুষের জন্য বিয়ের সময়ই এমন জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা উচিত, যিনি একজন আদর্শ মা হওয়ার গুণাবলি ধারণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশ বংশের নারীদের প্রশংসা করে বলেন—

خَيْرُ نِسَاءِ رَكِبْنَ الْإِبِلَ نِسَاءُ قُرَيْشٍ، أَحْنَاهُ عَلَى وَلَدٍ فِي صِغَرِهِ، وَأَرْعَاهُ عَلَى زَوْجٍ فِي ذَاتِ يَدِهِ

‘উটে আরোহনকারী নারীদের মধ্যে কুরাইশ নারীরাই উত্তম; তারা সন্তানদের প্রতি সবচেয়ে বেশি স্নেহশীল এবং স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যত্নশীল।’ (বুখারি ৫০৮২)

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতিও ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। যদি রোজা রাখার কারণে মা বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে শরিয়ত তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রেখেছে।

ভালোবাসা ও স্নেহের অধিকার

জন্মের পর থেকেই শিশুর মৌলিক অধিকার কার্যকর হয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে পুষ্টিকর খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসাসেবা, আকিকা এবং যথাযথ পরিচর্যা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ

‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৩৩)

ইসলাম সন্তানের সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

إِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ

‘কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের এবং তোমাদের পিতাদের নামে ডাকা হবে। তাই তোমরা সুন্দর নাম রাখো।’ (আবু দাউদ ৪৯৪৮)

সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন।

তিনি বলেন—

لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا

‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি ১৯১৯)

আরেকটি ঘটনায় এক ব্যক্তি বলেন, তার দশটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো কাউকে চুমু খাননি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ

‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি ৬০১৩)

মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা

ইসলামী শরিয়ত প্রতিটি শিশুর একটি সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أَفْضَلُ الدِّينَارِ دِينَارٌ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ

‘সর্বোত্তম ব্যয় হলো সেই ব্যয়, যা একজন ব্যক্তি তার পরিবারের জন্য করে।’ (মুসলিম ৯৯৪)

এমনকি বিবাহবিচ্ছেদের পরও সন্তানের খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব বাবার ওপর বর্তায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ

‘সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ৭)

জন্মের পর থেকেই সন্তানকে উত্তরাধিকারের অধিকার প্রদান করে ইসলাম তার আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছে।

সন্তানদের মাঝে সমতা ও ন্যায়বিচার

ইসলাম সব সন্তানের প্রতি সমান আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। উপহার, অর্থ ব্যয় কিংবা ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো সন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

اتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ

‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা ৩০৩৪৬)

তৎকালীন বৈষম্যমূলক সমাজে ইসলাম যেমন সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তেমনি পারিবারিক জীবনেও সন্তানদের মাঝে সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত, আর এই আমানতের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই মা-বাবা ইহকাল ও পরকালে সফলতা অর্জন করতে পারেন।

সন্তান শুধু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নয়; তারা একটি জাতির আগামী দিনের পরিচয়। তাই তাদের জন্য খাদ্য, শিক্ষা ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, দ্বীনি শিক্ষা এবং উত্তম চরিত্র গঠনের পরিবেশ।

মা-বাবা যখন সন্তানকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখবেন এবং ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করবেন, তখনই গড়ে উঠবে আদর্শ পরিবার, আদর্শ সমাজ এবং একটি কল্যাণময় প্রজন্ম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সন্তানদের হক আদায় করার তৌফিক দান করুন এবং তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন।

0%
0%
No Comment Yet