একের পর এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড: শঙ্কিত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা

গান হবে, মঞ্চে শিল্পীরা গাইবেন আর দর্শকরা তা উপভোগ করবেন—এটাই ছিল আবহমান বাংলার চিরচেনা সংস্কৃতি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জেঁকে বসেছে এক অজানা আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কনসার্ট, বাউল গানের আসর, এমনকি ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ আয়োজনেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কোথাও ধর্মীয় অনুভূতি, আবার কোথাও নিরাপত্তার অজুহাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাতিল করা হচ্ছে পূর্বনির্ধারিত আয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

সম্প্রতি গত ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও গায়ক নোবেলের একটি কনসার্ট স্থানীয় ওলামা পরিষদের আপত্তির মুখে বাতিল করে জেলা প্রশাসন। এর একদিন আগে ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

কেবল আধুনিক কনসার্টই নয়, বাধার মুখে পড়ছে গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতিও। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া নেত্রকোনার মদনেও বাউলগান বন্ধ করে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে কেবল ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়েছে।

বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচও এখন বাধার মুখে। সিলেটের বিয়ানীবাজারে ২৮ আগস্টের নির্ধারিত নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই বছর পর নৌকাবাইচের অনুমতি মিললেও জুড়ে দেওয়া হয়েছে কঠোর শর্ত। সেখানে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা নাচানাচি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে প্রশাসন।

 সাংস্কৃতিক এই অস্থিরতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা। নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, "আপত্তি থাকলেই অনুষ্ঠান বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হলে দেশের যুবসমাজ বিপথে যাবে।"

বরেণ্য নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার মনে করেন, এ ধরনের বাধা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। সবাইকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নির্মাতা অনন্ত হীরা বলেন, একটি গোষ্ঠী সংস্কৃতিচর্চাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। অন্যদিকে ব্যান্ডশিল্পী হামিন আহমেদ মনে করেন, প্রশাসনের কাজ অনুষ্ঠান বন্ধ করা নয়, বরং শিল্পী ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর সরকারের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি জানিয়ে বলেন, "দেশে গান-বাজনা হবে কি না, তা সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে। সংবিধানে নিষেধ থাকলে শিল্পীরা অন্য পথ দেখবেন।"

আশঙ্কা ‘আত্মসংকোচনের’ সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরাসরি হামলার চেয়েও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হামলার ভয়’। এই ভয়ের কারণে আয়োজকরা অনুষ্ঠান করতে সাহস পাচ্ছেন না, শিল্পীরা ঢাকার বাইরে যেতে নিরাপদ বোধ করছেন না। এই ‘অজানা আতঙ্ক’ বাংলাদেশের বহুত্বের ও সহনশীলতার সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, ভিন্নমত বা সমালোচনা করার অধিকার সবার থাকলেও ভয়ভীতি বা বেআইনি চাপ প্রয়োগ করে কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সব ধরনের আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন বজায় রাখা।

0%
0%
No Comment Yet