দারিদ্র্য মুক্তি কোনো করুণা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ সময়: ০৯:৩১:৩২
একসময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সেই সুবিশাল আকাশচুম্বী অট্টালিকার সামনে দাঁড়িয়ে কত পড়ন্ত বিকেল কেটেছে।
কিছুটা অলস ফুরসতে রাস্তার পাশ থেকে কেনা গরম হানি রোস্টেড বাদামের মচমচে স্বাদ নিতে নিতে সোনালী আলোয় আলোকিত ইস্ট রিভারের বাতাস গায়ে মাখা কিংবা ব্রায়ান্ট পার্কের ওপেন এয়ার লাইব্রেরিতে বসে খোলা আকাশের নিচে বইয়ের পাতায় ডুব দেওয়ার সেই স্মৃতিগুলো আজ বড্ড জীবন্ত।
যে ব্যক্তিটি সেখানে ৩ ফিট বাই ৩ ফিটের ছোট্ট ভেন্ডিং ট্রলিতে বৈধ পারমিট নিয়ে হাসিমুখে বাদাম ভেজে বিক্রি করছিলেন, তাঁর গল্পটি ছিল আরও গভীর। ১৯৯১ সালের দিকে তিনি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় অভিবাসিত হয়েছিলেন। পরিবার-পরিজনকে নিয়ে একটু সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকার তাগিদ এবং দারিদ্র্য বিমোচনের অদম্য লক্ষ্যই তাঁকে এই ভিনদেশে টেনে এনেছিল। নিজের কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে এই ফুটপাতেই তিনি এক সম্মানজনক ও পরিচ্ছন্ন জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর সেই ঘামঝরা শ্রমের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য আত্মসম্মানবোধ।
ঠিক তাঁর পেছনের সেই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ভবনের দিকে তাকালেই ভেসে ওঠে বিশ্ব মানবতার জন্য লেখা এক মহৎ অঙ্গীকারের কথা— ‘Goal 1: No Poverty’। এই লক্ষ্যটির বুকে খোদাই করা মূল বার্তাটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং মানব সভ্যতার জন্য এক ঐতিহাসিক দলিল: “Eradicating poverty is not a task of charity, it is an act of justice and the key to unlocking an enormous human potential” (দারিদ্র্য বিচ্ছেদ বা দূরীকরণ কোনো করুণা বা দানের কাজ নয়, এটি ন্যায়বিচারের একটি পদক্ষেপ এবং মানুষের বিশাল সম্ভাবনা উন্মোচনের মূল চাবিকাঠি)।
ওই বাদাম বিক্রেতার সততা আর শ্রমই প্রমাণ করে— দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইটা মানুষের দয়া বা দান-খয়রাতের ওপর নির্ভর করে না; মানুষ চায় কেবল একটি সমান সুযোগ ও সম্মানের সাথে বাঁচার পথ। কিন্তু জাতিসংঘের সেই ঝলমলে অট্টালিকার বাইরে বাস্তব বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের নিত্যদিনের নির্ঘণ্টের দিকে তাকালে বোঝা যায় এই পথ কতটা বিষম ও বন্ধুর।
সূর্য ওঠার অনেক আগেই যাদের দিন শুরু হয় আহারের সন্ধানে, আর গভীর রাতে অনিশ্চয়তার ক্লান্তি নিয়ে যাদের চোখ বোজে—তাদের পুরো ২৪ ঘণ্টার সময়সূচিটাই কেবল টিকে থাকার এক আদিম লড়াই। খেতমজুর, কারখানা শ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা দিনমজুরের প্রতিদিনের রুটিন কোনো ছন্দময় জীবনের গল্প বলে না; তা বলে কেবল টিকে থাকার শারীরিক সংগ্রামের কথা। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পুরো শক্তি নিংড়ে দেওয়ার পরও তাদের উপার্জনে নিশ্চিত হয় না সন্তানের পুষ্টিকর খাদ্য, আলো-বাতাসপূর্ণ একটি নিরাপদ ঘর কিংবা অসুস্থতার দিনে ন্যূনতম চিকিৎসার নিশ্চয়তা।
এমন একটি অসুস্থ ও বৈষম্যপীড়িত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবেলা করে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকা—মানুষ হিসেবে জীবনের কেমন সংজ্ঞা তৈরি করে? যেখানে জীবনের অর্থ দাঁড়ায় কেবল ‘কোনোমতে নিশ্বাস টেনে যাওয়া’। অথচ মানুষের জীবনের আসল প্রকাশ ঘটার কথা ছিল জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, উদ্ভাবন ও স্বপ্নের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশে। বিশ্বজুড়ে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (MPI) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় ১১০টি দেশের মধ্যে ১১০ কোটিরও বেশি মানুষ চরম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখার নিচে অবস্থানকারী প্রায় ৭০ কোটি মানুষ প্রতিদিন মাত্র ২.১৫ ডলারের কম আয়ে জীবনধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান কেবল শুষ্ক সংখ্যা নয়; এগুলো একেকটি বিপন্ন জীবনের করুণ বাস্তবতার দলিল।
যখন সমাজের এক শতাংশ মানুষের হাতে বিশ্বের সিংহভাগ সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে ওঠে, আর অন্যপাশে কোটি কোটি মানুষ আহারের খোঁজে ব্যাকুল থাকে, তখন তা প্রমাণ করে যে দারিদ্র্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্ভাগ্য বা অলৌকিক অভিশাপ নয়। দারিদ্র্য হলো নীতি নির্ধারণের ব্যর্থতা, বাজার অর্থনীতির লাগামহীন শোষণ এবং সম্পদের চরম অসম বন্টনের ফসল। বহু শতাব্দী ধরে দারিদ্র্যকে ব্যক্তির অলসতা বা ভাগ্যের ফৈজ হিসেবে বিবেচনা করে একে সামাজিক ‘দান-খয়রাত’ বা চেতনার করুণার ফ্রেমে বাঁধানো হয়েছে। কিন্তু দান কখনো বৈষম্যের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে পারে না; তা হয়তো সাময়িক ক্ষুধার জ্বালা উপশম করে, কিন্তু মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি বা আত্মমর্যাদা প্রদান করতে পারে না।
UNDP-এর বার্তা আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে অনুধাবন করায় যে, কোটি কোটি মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা এক ধরনের কাঠামোগত সামাজিক সহিংসতা। আর তাদের এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনা কোনো দয়া বা দান নয়, বরং তাদের ছিনিয়ে নেওয়া মৌলিক মানব অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এক অবশ্যম্ভাবী ন্যায়বিচার।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
একটি শিশু যখন দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ পায় না, বা একজন তরুণ যখন অর্থের অভাবে তার ভেতরের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারে না, তখন সেই ক্ষতি কেবল ওই ব্যক্তির বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমগ্র বিশ্বসমাজ এক সম্ভাব্য বিজ্ঞানী, দার্শনিক, প্র প্রকৌশলী বা দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ককে হারায়। দারিদ্র্যের এই শেকল দিয়ে আমরা আসলে মানুষের অফুরন্ত সম্ভাবনাকে হাতকড়া দিয়ে রেখেছি। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, মানসম্মত বিশ্বজনীন শিক্ষা, বিশ্বস্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং কাজের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে পারে, তবেই সেই মানব সম্ভাবনার রুদ্ধ দুয়ার উন্মুক্ত হওয়া সম্ভব।
তাই এই বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে আমাদের চিন্তাধারায় আমূল রূপান্তর আনতে হবে। মেকি দানশীলতার মানসিকতা পেছনে ফেলে বিশ্বব্যাপী রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, শ্রমের ন্যায্য মূল্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, প্রান্তিক জনগণের জন্য সহজ ঋণ ও পুঁজির ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের সেই সুবিশাল সদরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই অদম্য বাদাম বিক্রেতার মতো কোটি কোটি মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, সততা ও আত্মমর্যাদাকে আমাদের শ্রদ্ধা জানানো উচিত। করুণার হাত বাড়িয়ে নয়, বরং ন্যায়বিচারের সুদৃঢ় ভিত তৈরি করে প্রতিটি মানুষের ভিতরের সুপ্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত হওয়ার পূর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেওয়াই হোক একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
No Comment Yet