জ্বালানির বাড়তি দাম এড়াতে দামেস্কে বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন চালকেরা

ঢাকা, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস) :  পেট্রোলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে পুরোনো গাড়ি চালানো ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। তাই আয় বাড়ানোর আশায় সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের রাস্তায় নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে নেমেছেন ট্যাক্সিচালক মোহাম্মদ কানান।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

তিনি এখন একটি নতুন চকচকে বৈদ্যুতিক গাড়ি চালিয়ে শহরের জরাজীর্ণ রাস্তায় যাত্রী পরিবহন করছেন। 

তার আশা, জ্বালানি খরচ কমিয়ে আগের তুলনায় বেশি আয় করতে পারবেন।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বারবার জ্বালানি সংকট এবং সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর কিছু বাসিন্দা এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। এসব গাড়ির অধিকাংশই চীনে তৈরি।

৪২ বছর বয়সী কানান বলেন, ‘আগে আমার পেট্রোলচালিত গাড়ি ছিল। কিন্তু সম্প্রতি জ্বালানির মান খারাপ হয়েছে এবং দামও বেড়েছে।’

তিনি জানান, আগে গাড়ি চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল।

এএফপিকে তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিই এবং গাড়ি চার্জ দেওয়ার জন্য নিজস্ব চার্জিং ব্যবস্থাও স্থাপন করি।’

প্রায় দুই বছর আগে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দামেস্কের রাস্তায় আধুনিক গাড়ি দেখা ছিল বেশ বিরল। বিশেষ করে ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতি ভেঙে পড়ায় এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে নতুন গাড়ি আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে নতুন কর্তৃপক্ষ ক্ষমতায় আসার পর এসব নিষেধাজ্ঞার বেশির ভাগই তুলে নেওয়া হয়েছে।

নতুন কর্তৃপক্ষ ক্ষমতা গ্রহণের পর আমদানি শুল্ক কমানো হলে প্রায় ১ লাখ গাড়ি আমদানি করা হয়। তবে গাড়ির মান নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় পরে পুরোনো গাড়ি আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তবে সব সিরীয় নাগরিকের পক্ষে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা সম্ভব নয়। দেশটির অধিকাংশ মানুষ এখনো দারিদ্র্েযর মধ্যে বসবাস করায় বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারকারীর সংখ্যা মোট গাড়ির তুলনায় এখনো নগণ্য।

নিম্নমানের পেট্রোল নিয়ে উদ্বেগ

গত মাসে পেট্রোলের দাম ২৬ শতাংশ বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সিরিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন সাধারণ মানুষ। আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার এ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়।

কানান জানান, তার আগের পেট্রোলচালিত গাড়িতে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ চলতে ২৬ ডলারের পেট্রোল লাগত। অথচ এখন সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা থেকে গাড়ি চার্জ করে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে খরচ হচ্ছে মাত্র ৬ ডলার।

গৃহযুদ্ধের সময় দামেস্কে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকত। তবে অর্থনীতি ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে সরকারের উদ্যোগের ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

তারপরও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি এড়াতে কিছু বৈদ্যুতিক গাড়ির মালিক সৌরবিদ্যুৎচালিত চার্জিং স্টেশন স্থাপন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

Shwapno Super Shop

তবে জ্বালানির মান নিয়ে সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে নিম্নমানের এক চালান পেট্রোল বাজারে আসায় শত শত গাড়িতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং অনেক গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে বলে চালকেরা এএফপিকে জানিয়েছেন।

পরে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, ‘কারিগরি পরিচালনাগত ত্রুটির’ কারণে নিম্নমানের ওই পেট্রোল বাজারে পৌঁছেছিল। এ ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িচালকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয় মন্ত্রণালয়।

সিরিয়া আংশিকভাবে আমদানি করা পেট্রোলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সংকট এবং পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তিতে পড়তে হয় দেশটির সাধারণ মানুষকে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা গত মাসে জানায়, সিরিয়ায় দৈনিক গড়ে প্রায় ২৩ লাখ ২০ হাজার লিটার পেট্রোল সরবরাহ করা হয়। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানি করা।
‘সবাই খুশি’

দামেস্কের বাইরে নিজেদের পারিবারিক গাড়ির শোরুমে বিভিন্ন গাড়ির মধ্যে ঘুরে ঘুরে ২৫ বছর বয়সী হামজা সুক্কার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘গত প্রায় আট মাসে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি এবং নিম্নমানের জ্বালানির কারণে বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির চাহিদা বেড়েছে। ফলে মানুষ এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছে।’

তার শোরুমে সবচেয়ে কম দামের পেট্রোলচালিত গাড়ির মূল্য ১২ হাজার ডলারের বেশি। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম শুরু হয়েছে ৯ হাজার ডলার থেকে। ফলে ক্রেতাদের কাছে এসব গাড়ি ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

সুক্কার বলেন, ‘এখন আমরা প্রতিটি পেট্রোলচালিত গাড়ির বিপরীতে তিন থেকে চারটি বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করছি।’

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ২০২৫ সালে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির প্রতি চারটির মধ্যে একটি ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি।

সিরিয়ায় এখনো বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৈশ্বিক এই হারের ধারেকাছেও পৌঁছায়নি। তবে দেশটিতে এ ধরনের গাড়ির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

পরিবহন খাতেও এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে।

দামেস্কের জনপ্রিয় অনলাইন রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ইয়ালাগো!-এর কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় কার্যক্রম ব্যবস্থাপক রামি আল-হামাদ বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁদের প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি জানান, পেট্রোলচালিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় চালকেরা বেশি মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে হামাদ উল্লেখ করেন, অনেক সিরীয় নাগরিকেরই বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এ ছাড়া নিয়মিত চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণও অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তিন মাস ধরে বৈদ্যুতিক গাড়ি চালাচ্ছেন ট্যাক্সিচালক আহমেদ আল-লাহহাম। নতুন গাড়ি ব্যবহারে সন্তুষ্ট তিনি।

0%
0%
No Comment Yet