দেশের বাইরে পড়াশোনার জন্য ফেসবুক যেভাবে ব্যবহার করবেন

এক সময় বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ ছিল মূলত ধনী পরিবারের সন্তানদের বা যাদের আত্মীয়স্বজন দেশের বাইরে থাকতেন, তাদের জন্য। কারণ বিদেশে পড়তে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য তখন খুব কম ছিল। কিন্তু গত এক দশকে এই চিত্র বদলে গেছে।

এখন কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা গ্রামের শিক্ষকের সন্তানরাও বিদেশে পড়তে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তথ্যের অবাধ প্রবাহ। আমরা সাধারণত এ ক্ষেত্রে গুগলকে কৃতিত্ব দেই। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া—বিশেষ করে ফেসবুকের অবদান প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।

আমার নিজের দেশের বাইরে পড়াশোনার যাত্রায় ফেসবুকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফেসবুকে উচ্চশিক্ষাবিষয়ক অসংখ্য গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশিদের তৈরি গ্রুপগুলো থেকে আমি যে সহায়তা পেয়েছি, তার কৃতজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এসব গ্রুপে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একে অন্যকে সাহায্য করে, ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য খুব দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যায়।

আমার পরিবারের কেউ আগে কখনো পড়াশোনা বা কাজের জন্য বিদেশে যাননি। তাই যখন আমি বিদেশে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করি, নিজেকে বেশ একা মনে হয়েছিল। তখন আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিনিয়র এবং যারা আগে বিদেশে গেছেন—তাদের ফেসবুকে নক দিতাম, প্রশ্ন করতাম, গাইডেন্স চাইতাম। এই যাত্রা দীর্ঘ এবং ধাপে ধাপে এগোতে হয়—আইইএলটিএস থেকে শুরু করে ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত। শুধু পরিশ্রম করলেই হয় না, সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে যে কোনো ধাপে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

গুগল তথ্যের ভালো উৎস হলেও ফেসবুক গ্রুপগুলো বেশি ইন্টারেক্টিভ। এখানে মানুষ নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করে—কখনো কৃতজ্ঞতা থেকে, কখনো দায়বদ্ধতা থেকে, আবার কেউ সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির আশায়। অথচ বিদেশে পড়তে যাওয়ার জন্য কোনো এজেন্সিতে গেলে সামান্য কাজের জন্যও বড় অঙ্কের টাকা গুনতে হয়, যা সবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। নিজের কাজ নিজে করার মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, তা এজেন্সির মাধ্যমে সম্ভব নয়।

ফেসবুকে নির্দিষ্ট দেশ বা নির্দিষ্ট স্কলারশিপভিত্তিক অনেক গ্রুপ আছে। যেমন—গ্লোবাল কোরিয়া স্কলারশিপ, স্টাইপেনডিয়াম হাঙ্গেরিকাম, তুর্কিশ বুর্সলারি, ইরাসমাস মুন্ডাস ইত্যাদি। এসব গ্রুপে যারা ইতিমধ্যে বিদেশে পড়ছেন, তারা দেশের বাইরে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যা নতুনদের জন্য ভীষণ সহায়ক। কোনো প্রশ্ন পোস্ট করলে সেখানে বহু মানুষ উত্তর দিয়ে সমাধানে সাহায্য করেন। এখানে কোনো প্রশ্নই গুরুত্বহীন নয়।

এই গ্রুপগুলোর মাধ্যমে আমি অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, যারা আমাকে নিয়মিত সহায়তা করেছেন এবং এখনো করছেন। পরে আমি নিজেও অন্যদের তথ্য দিয়ে, আবেদনপত্র যাচাই করে, অভিজ্ঞতা শেয়ার করে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। এটি আসলে একটি চেইনের মতো—আপনি সাহায্য নেবেন, আবার সাহায্য করবেন।

আমি বিদেশে অন্তত তিনটি শহরে থেকেছি। প্রতিটি শহরেই বাসা ভাড়া, বাজার করা, পড়াশোনায় মানিয়ে নেওয়া—এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিকে পাশে পেয়েছি। এসব কমিউনিটিও আমি খুঁজে পেয়েছি ফেসবুকের মাধ্যমেই। ভার্সিটির নাম/শহরের নাম বাংলাদেশ, এভাবে সার্চ দিলেই এসব কমিউনিটি খুঁজে পেয়ে যাবেন।

বিজ্ঞাপন
Dutch-Bangla bank New account opening free visa debit card

Dutch-Bangla bank New account opening free visa debit card

একসময় আমার মনে হতো, যদি একজন বড় ভাই থাকতেন, তাহলে তিনি আমাকে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নিয়ে গাইড করতেন। পরে এক বন্ধুর কথায় উপলব্ধি করি—‘বড় ভাই না থাকলেও বড় ভাই বানানো যায়।’ এরপর আমি নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি এবং তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে থাকি।

ভদ্রভাবে সম্মান দেখিয়ে কথা বললে বেশিরভাগ মানুষই সাহায্য করতে আগ্রহী হন। তবে মনে রাখতে হবে, কেউ তার সময় দিয়ে সাহায্য করলে সেটি তার বাধ্যবাধকতা নয়। এই সম্মানবোধ বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমার মেন্টররা ব্যস্ততার মধ্যেও সময় দিয়ে আমাকে গাইড করেছেন। তারা সবচেয়ে বেশি খুশি হন, যখন দেখেন তাদের পরামর্শ কাজে লাগিয়ে কেউ জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। অনেক মেন্টরের সঙ্গে বছরের পর বছর শুধু অনলাইন বা ফোনে যোগাযোগ ছিল, পরে সরাসরি দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছে—সেই মুহূর্তগুলো ছিল বিশেষ স্মরণীয়।

বর্তমান সময়ে সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত। এখন আর জমিদারি যুগ নেই—চেষ্টা ও পরিশ্রম করলে যে কেউ বিদেশে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। ফেসবুক নিয়ে নেতিবাচক কথা অনেক শোনা যায়, কিন্তু এর ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগাতে পারলে ব্যক্তি ও দেশ—উভয়ই উপকৃত হবে। তথ্যই শক্তি, আর নেটওয়ার্কিং হলো সেই শক্তিতে পৌঁছানোর সেতু। বর্তমানে ফেসবুকই সেই সেতুর প্রবেশদ্বার।

তবে সচেতন ব্যবহার জরুরি। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে ফেসবুক ব্যবহার করলে মনোযোগ ও ফোকাস ঠিক থাকে। অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহার এগিয়ে নেওয়ার বদলে পিছিয়ে দিতে পারে।

লেখক : সাকলাইন মোস্তাক, পিএইচডি গবেষক, যুক্তরাষ্ট্র

0%
0%
No Comment Yet