বান্দরবানের আলীকদমে গুপ্ত হামলায় আহত ১৮ জন: প্রতিবাদে মানববন্ধন

বান্দরবানের আলীকদমে কলা চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ম্রো জনগোষ্ঠীর ওপর অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন ম্রো ইয়ূথ অর্গানাইজেশন। ম্রো সম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। 

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি ) সকালে  উপজেলা পরিষদ চত্বরে  মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শুরুর আগে আর্দশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়ে উপজেলায় এসে শেষ হয়।  সর্বস্তরের সচেতন জনগণের উপস্থিতিতে ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের সভাপতি সেথং ম্রো’র নেতৃত্বে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন-নয়াপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ কফিল উদ্দিন, জেএসএস রাজনৈতিক দলের আলীকদম উপজেলা সভাপতি পিলিপ ত্রিপুরা, আলীকদম মৌজার হেডম্যান অক্যজাই মারমা, ম্রো ইয়ূথের সভাপতি  সেথং ম্রো, জানালীপাড়ার কারবারি পাচ্ছো ম্রো সহ ৩০০ জন স্থানীয় বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন। 

পাচ্ছ ম্রো কারবারির মালিকানাধীন কলা বাগান থেকে সন্ত্রাসী জাফর চুরি করতে গেলে স্থানীয়রা তাকে হাতেনাতে আটক করে রাখে। বিষয়টি জানতে পেরে জাফর আলমের পক্ষের ১০-১২ জন লোক ঘটনাস্থলে এসে ম্রো সম্প্রদায়ের লোকদের সঙ্গে মারামারি করে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। এতে পাচ্ছ ম্রো কারবারির পক্ষের কয়েকজন আহত হন। পরে তারা যখন থানায় অভিযোগ করতে যায় ফেরার পথে ঘটনার জের ধরে শুক্রবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে  আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাচ্ছ ম্রো কারবারির ছেলে ও তাদের পাড়ার লোকজন বাড়ি ফেরার পথে দক্ষিণ নয়াপাড়া এলাকায় পৌঁছালে জাফর আলমের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।হামলাকারীরা লাঠিসোটা নিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করলে ১৮ জন  আহত হন। এতে  গুরুতর আহত হন ৬ জন । আহতরা হলেন— অমর ত্রিপুরা (৫৫), ডাংইয়া ম্রো (৫৩), পেক কিউ ম্রো (২৬), লাংচিং ম্রো (৩৩), খংনং ম্রো (৫৫) ও অংচং ম্রো (৩০)। সকলেই জানালীপাড়া, ৯নং ওয়ার্ড, ৩নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। গুরুতর আহত হওয়ায় - অমর ত্রিপুরা, ডাংইয়া ম্রো ও খংনং ম্রো
এই তিনজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। অপর আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা সন্ত্রাসী জাফর আলমের সহিংস কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তারা অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বক্তারা বলেন, জাফরের মতো সন্ত্রাসীদের কারণে আলীকদমের সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

মানববন্ধনে বক্তারা আলীকদম সেনা জোনের জোন কমান্ডার মহোদয়কে ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, ঘটনার পরপরই সেনা জোনের পক্ষ থেকে সদস্য পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বক্তারা আরও বলেন, জাফর আলমকে ধরতে সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়।

ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের সভাপতি সেথং ম্রো বলেন, "আগামী সাত দিনের মধ্যে সন্ত্রাসী জাফর আলমকে গ্রেপ্তার করা না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব। তখন সম্প্রীতির আলীকদম আর আলীকদম থাকবে না।" তিনি সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রশংসা করেন।

জানালীপাড়ার কারবারি পাচ্ছ ম্রো বলেন, “আলীকদম সবসময় সম্প্রীতির জায়গা ছিল। এখানে আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। জাফরের মতো সন্ত্রাসীরা সাহস না পেলে এমন দাঙ্গা কখনও হতো না। ভবিষ্যতে রক্তপাত এড়াতে দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

হেডম্যান অক্যজয় মারমা, তিনি বলেন- “এই পরিস্থিতি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। সেনাবাহিনী বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। এজন্য আমরা সেনা জোনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিন।”

বিজ্ঞাপন

Anjara World Shop

নয়াপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ কফিল উদ্দিন বলেন, “জাফর একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। দীর্ঘদিন ধরে সে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে আসছে। বহুবার সতর্ক করা হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জাফর সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এবং সন্ত্রাসী জাফরকে তিন কার্য দিবসের মধ্যে গ্রেপ্তার করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। 

প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, তিনি বলেন- “দীর্ঘদিন ধরে জাফরের অপকর্মের কথা শুনে আসছি। সতর্ক করেও সে থামেনি। দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করা জরুরি।"

মানববন্ধনকারীদের পক্ষ থেকে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলমের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ইউএনও মনজুর আলম স্মারকলিপি গ্রহণ করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

এ ঘটনায় আলীকদম থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আলীকদম থানার মামলা নম্বর– ০৩/২০২৬। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবু সাইদ জানান, এই ঘটনায় ১০ জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজন আসামিকে আটক করা হয়েছে।বাকি আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও জানান, রাতেও আলীকদম থানা পুলিশের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

এ মুহূর্তে অভিযুক্তদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসআই আবু সাইদ বলেন, “আমরা অভিযুক্ত সবাইকে চিহ্নিত করেছি। খুব দ্রুত সবাইকে গ্রেফতার করা হবে।” পুলিশ সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় নিয়মিত টহল চলছে।

এলাকাবাসী আশা প্রকাশ করেন, আলীকদম সেনা জোনের জোন কমান্ডার মহোদয়ের নির্দেশনায় চলমান অভিযানের মাধ্যমে দ্রুত সন্ত্রাসী জাফর আলম গ্রেপ্তার হবে এবং এলাকায় আবার শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরে আসবে।

0%
0%
No Comment Yet