পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার পর আত্মহত্যা? পদ্মা সেতুর ফুটেজে মিলল সূত্র
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ সময়: ২৩:৪৭:০৯
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবারের সদস্যদের ঘুমের ওষুধ বা অচেতনকারী কিছু খাইয়ে কুপিয়ে হত্যার পর অভিযুক্ত গৃহকর্তা মো. ফোরকান মোল্লা পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে এ ধারণা জোরালো হয়েছে।
এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ফোরকানের স্ত্রী মোছা. শারমিন (৩৫), তাঁদের তিন মেয়ে—মীম (১৬), মারিয়া (৮) ও ফারিয়া (২) এবং শ্যালক মো. রসূল মোল্লা (২২)। গত ৯ মে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা পূর্বপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় কাপাসিয়া থানায় নিহত শারমিনের বাবা মো. শাহাদৎ মোল্লা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলাটি ১০ মে পেনাল কোডের ৩২৮/৩০২/৩৪ ধারায় রুজু করা হয়। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে কাপাসিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. যোবায়েরের ওপর।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে মো. ফোরকান মোল্লার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় গোপালগঞ্জের পাইককান্দি গ্রামের মোছা. শারমিনের। তাঁদের সংসারে তিন মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়।
স্বজন ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, বিয়ের পর থেকেই নানা বিষয় নিয়ে স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। প্রায় ছয় মাস আগে ফোরকান স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা পূর্বপাড়া এলাকায় মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ওঠেন। তিনি পেশায় একটি প্রাইভেটকারের চালক ছিলেন।
গত ৮ মে রাতে ফোরকান তাঁর শ্যালক রসূল মোল্লাকে চাকরির কথা বলে গোপালগঞ্জ থেকে কাপাসিয়ায় নিয়ে আসেন। এরপর রাত আটটা থেকে পরদিন ভোর পাঁচটার মধ্যে কোনো একসময় পরিকল্পিতভাবে পরিবারের সদস্যদের রাতের খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ বা অচেতনকারী পদার্থ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তাঁদের কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে আলামত উদ্ধার
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে পুলিশ সুপার গাজীপুরের নির্দেশনায় কাপাসিয়া থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পুলিশ পাঁচটি মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতিসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। বাসার ভেতরের পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা হয়, হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল।
পদ্মা সেতুর ফুটেজে ‘শেষ দেখা’
হত্যার ঘটনার পর থেকেই ফোরকান মোল্লাকে খুঁজছিল পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে গত ১১ মে মেহেরপুর সদর থানা এলাকা থেকে মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
গাজীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি ট্রাকের হেল্পার ১১ মে সকাল আনুমানিক ৬টা ৫০ মিনিটে পদ্মা সেতুর মাঝামাঝি স্থানে রেলিংয়ের পাশে মোবাইল ফোনটি পড়ে থাকতে দেখে নিজের
রেখে দেন। পরে তদন্তের মাধ্যমে সেই মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
এরপর পদ্মা সেতুর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, একই দিন সকাল ৬টা ৪২ মিনিটে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার থেকে নেমে সেতুর রেলিংয়ের পাশে কিছু রাখেন। এরপর কয়েক মিনিট সেখানে অবস্থান করে তিনি রেলিং টপকে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দেন।
তদন্তকারীদের দাবি, সিসিটিভিতে দেখা ওই ব্যক্তিই ফোরকান মোল্লা। পুলিশের ধারণা, পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন।
পুলিশ বলছে, ফোরকান মোল্লার সন্ধানে পদ্মা সেতু-সংলগ্ন বিভিন্ন থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাঁর মরদেহ উদ্ধার কিংবা অন্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।
No Comment Yet