পুরনো কাগজের গন্ধে নতুন স্বপ্ন
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬ সময়: ১৩:৫০:৪৯
গ্লাসগোর আকাশে তখন মেঘের ভেলা। বাইরে ঠান্ডা বাতাস। ব্যস্ত শহরের মানুষ ছুটছেন নিজের গন্তব্যে। কেউ অফিসে, কেউ বাজারে, কেউ হয়তো স্টেডিয়ামের পথে। শহরের এক কোণে এক অন্যরকম নীরবতা। সেখানে সময় একটু ধীরে হাঁটে। সেই জায়গার নাম লাইব্রেরি। দরজা খুললেই অন্য এক পৃথিবী। চারদিকে বইয়ের তাক। পুরোনো কাগজের গন্ধ। কেউ গভীর মনোযোগে পড়ছেন, কেউ গবেষণায় ডুবে আছেন, কেউ আবার ছোট্ট শিশুকে নিয়ে এসেছেন গল্পের বইয়ের জগতে। বাইরে পৃথিবী যত দ্রুত বদলাক, এই ঘরের ভেতর জ্ঞানের নদী বয়ে চলে নিজের ছন্দে।
স্কটল্যান্ডের জাতীয় গ্রন্থাগার, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব স্কটল্যান্ড, দেশের সাহিত্য, ইতিহাস, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। সেখানে রয়েছে পুরোনো পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক নথি, বই, চলচ্চিত্র, মানচিত্র এবং ডিজিটাল সংগ্রহ। শুধু গবেষক নয়, সাধারণ পাঠকদের জন্যও জ্ঞানের দরজা খোলা থাকে।
স্কটল্যান্ডের লাইব্রেরি সংস্কৃতি শুধু বড় বড় জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি শহর, প্রতিটি এলাকার মানুষের কাছে পাবলিক লাইব্রেরি যেন একটি পরিচিত আশ্রয়। গ্লাসগোর মিচেল লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বইয়ের ভাণ্ডারের পাশাপাশি শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। মানুষ এখানে পড়তে আসেন, গবেষণা করেন, প্রদর্শনী দেখেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
স্কটিশ সমাজে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করানো হয়। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প, ইতিহাস, বিজ্ঞান, কল্পকাহিনির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে লাইব্রেরিতে যান। বই ধার নেওয়া এখানে কোনো বিশেষ ঘটনা নয়, দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার সঙ্গে তাকে কল্পনা করতে শেখানো। সে বইয়ের পাতায় পাহাড়ের গল্প পড়ছে। হয়তো সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস। হয়তো কোনো বিজ্ঞানীর জীবন। সেই ছোট ছোট গল্পের মধ্য দিয়েই তৈরি হচ্ছে তার বড় স্বপ্ন।
স্কটল্যান্ডের দীর্ঘ সাহিত্য ঐতিহ্যের পেছনেও রয়েছে এই পাঠাভ্যাসের বড় ভূমিকা। রবার্ট বার্নস থেকে শুরু করে আধুনিক লেখকদের সাহিত্য এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার অংশ। বৃষ্টিভেজা বিকালে অনেক স্কটিশ মানুষকে দেখা যায় ক্যাফেতে বসে বই পড়ছেন। ট্রেনে যাত্রার সময় কারও হাতে উপন্যাস, কারও হাতে ইতিহাসের বই। প্রযুক্তির যুগেও বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে যায়নি।
বিজ্ঞাপন
Dutch-Bangla bank New account opening free visa debit card
সময়ের সঙ্গে লাইব্রেরিও বদলেছে। বইয়ের সঙ্গে ডিজিটাল সংগ্রহ, অনলাইন তথ্যভাণ্ডার, কর্মশালা, শিশুদের কার্যক্রম যুক্ত হয়েছে। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব স্কটল্যান্ডও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সংগ্রহ মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দিচ্ছে। স্কটল্যান্ডে লাইব্রেরির আরেকটি বড় ভূমিকা সামাজিক। অনেক মানুষের কাছে এটা এক ধরনের কমিউনিটি স্পেস। কেউ ভাষা শেখেন, কেউ নতুন দক্ষতা অর্জন করেন, কেউ নিঃশব্দে বসে নিজের সময় কাটান। এখানে ধনী-গরিব, তরুণ, বৃদ্ধ—সবাই সমানভাবে প্রবেশাধিকার পান।
জ্ঞান কখনও পুরোনো হয় না। একটি বইয়ের বয়স হতে পারে একশো বছর, দুইশো বছর। তবে তার ভেতরের চিন্তা নতুন প্রজন্মের কাছে আবার নতুন হয়ে জন্ম নেয়। লাইব্রেরি আসলে একটি সময়যন্ত্র। যেখানে মানুষ অতীতে যেতে পারে, আবার ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখতে পারে। লাইব্রেরি শুধু বইয়ের ঘর নয়। একটি জাতির স্মৃতি। হাজার বছরের জ্ঞানের প্রদীপ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো দিয়ে যায়।
No Comment Yet