এলডিসি উত্তরণে অর্থনৈতিক রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে : অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর

ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের আগে পাওয়া অতিরিক্ত তিন বছরের প্রস্তুতিকাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বেশি অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা আদায়ের চেষ্টায় ব্যয় না করে দেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন করার কাজকে ত্বরান্বিত করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, ২০২৯ সালের পরের বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন শিল্পে বিনিয়োগ, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে প্রস্তুত করতে হবে।

আজ রাজধানীর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক গণমাধ্যম সংলাপে সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণকে শুধু সুবিধা বাড়ানোর বিষয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, অতিরিক্ত তিন বছর দেশের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন রপ্তানি সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজে লাগাতে হবে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটেছে এমন দেশগুলোর তুলনায় জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকার বিবেচনায় বাংলাদেশের এই উত্তরণ হবে নজিরবিহীন। তাই অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা হুবহু অনুসরণ না করে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে নিজস্ব কৌশল তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সামনে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের কারণে এ সুযোগ আরও বাড়ছে। এ কৌশলের আওতায় চীনের পাশাপাশি অন্য দেশেও উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, চীন ধীরে ধীরে সাধারণ পোশাক উৎপাদন থেকে সরে এসে উচ্চমূল্যের ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বড় অংশ দখলের সুযোগ রয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে এখনো সুতি বা তুলাভিত্তিক পোশাকের আধিক্য রয়েছে। অথচ বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার বা এমএমএফ) এবং সুতি-বহির্ভূত পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।

তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী বস্ত্র ও পোশাক পণ্যের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই নন-কটন ও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক। অথচ বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এখনো মূলত তুলানির্ভর।

রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে কৃত্রিম সুতা উৎপাদন, আধুনিক বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিযোগিতামূলক সুদহারে ব্যাংকঋণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

এলডিসি উত্তরণকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. রহমান বলেন, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পাশাপাশি অতিক্ষুদ্র, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএসএমই) জন্যও নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই ব্যাংকঋণ পাওয়া, ঋণপত্র (এলসি) খোলা, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়ে।

এসব উদ্যোক্তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন সুবিধা, ব্যাংকিং সেবা সহজ করা এবং টেকসই জ্বালানি মূল্যনীতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. রহমান বলেন, প্রচলিত উৎপাদন খাতের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর সংযোজন এবং সেবা রপ্তানির মতো নতুন খাতের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে।

তিনি বৈশ্বিক ‘সিলভার ইকোনমি’র সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, উন্নত দেশগুলোতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণদের পরিচর্যাসামগ্রী এবং এ-সংক্রান্ত পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে পরিবেশ, শ্রম ও সামাজিক মানদণ্ড অনুসরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, এলডিসি মর্যাদা থাকুক বা না থাকুক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরিবেশ সুরক্ষা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের শিল্প খাতের রূপান্তর এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে মাতারবাড়ী-মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগের (এমআইডিআই) কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন ড. রহমান।

তিনি বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে এ উদ্যোগ শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

২০২৯ সালের পরের বাণিজ্যিক পরিবেশের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা কাজে লাগিয়ে কৌশলগত অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে অবশিষ্ট উত্তরণকাল কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি।

তিনি বলেন, শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সমুদ্রবন্দর, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ স্থাপনে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের উন্নয়ন জরুরি। এতে ব্যবসায়িক ব্যয় কমার পাশাপাশি রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিষয়ে ড. রহমান কার্যকর নীতিনির্ধারণ ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মান উন্নয়ন এবং এসব তথ্যের সহজলভ্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, পাঁচটি স্তম্ভ, ৩০টি কর্মক্ষেত্র এবং ১৫৭টি সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম নিয়ে গঠিত বিদ্যমান মসৃণ উত্তরণ কৌশল (এসটিএস) এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো।

সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামো তৈরি না করে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান কৌশলটি পর্যালোচনা, হালনাগাদ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি।

0%
0%
No Comment Yet