অর্থনীতির হালচাল ও সম্ভাবনা
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সময়: ০৬:৪৪:৪১
চলতি বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল একদিকে চাপের, অন্যদিকে পুনর্গঠনের। আগের কয়েক বছরের বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতার রেশ এই বছরও বহন করতে হয়েছে। তবে একই সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কার, নীতিগত কঠোরতা এবং স্থিতিশীলতার পথে ফেরার কিছু লক্ষণও স্পষ্ট হয়েছে। আর তিনদিন পরই শুরু হবে ইংরেজি নতুন বছর ২০২৬ সাল। কেমন ছিল আমাদের এই বছরের অর্থনীতির হালচাল, এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন- জলি রহমান
রিজার্ভে স্বস্তি
গত বছরের (২০২৪) নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল বাবদ ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করার পরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী হয় ২০ বিলিয়ন ডলার। এরপর ক্রমবর্ধমান ধারায় চলতি বছরের জুলাইয়ে মোট রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি আসে, আইএমএফ অনুযায়ী ২৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়ে রিজার্ভে আর তেমন কোনো পতন পরিলক্ষিত হয়নি।
নভেম্বরে গ্রস রিজার্ভ প্রায় ৩১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার হয়, আইএমএফ অনুযায়ী ২৬ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। সর্বশেষ ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের কথা জানিয়েছে, যা ২০২৪ সালের আগস্টে ছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসের ২৩ দিনে দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে মোট ১৫ হাজার ৫৬৯ মিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৩ হাজার ৩৭০ মিলিয়ন ডলার। সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে, যা রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়েছে। আসন্ন বছরে বিনিময় হার স্থিতিশীল হওয়া, প্রবাস আয় বৃদ্ধি এবং সুদের হার বৃদ্ধির ফলে রিজার্ভ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতিতে ইতিবাচক ধারা
গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে বেঁধে রাখতে সরকারের যে লক্ষ্য ছিল, তা অর্জিত হয়নি। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, সরকারের গত অর্থবছরে (জুলাই ২০২৪-জুন ২০২৫) সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ হারে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ হয়েছে, যা মে মাসে ছিল ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হার জুনে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে। মে মাসে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে কমেছে মূল্যস্ফীতি। অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০২২ সালের পর সর্বনিম্ন। যদিও নভেম্বরে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এটি ইতিবাচক ধারা। খাদ্যদ্রব্য ও পোশাকের মূল্যস্ফীতি কমেছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে পরিবহন, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং বিবিধ পণ্যের দাম বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিচক্ষণ নীতি ও উন্নত বাণিজ্য পরিস্থিতির কারণে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। সরকারের লক্ষ্য ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামানো। আগামীতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ। সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি আশাবাদী বছর, যেখানে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো উন্নতির দিকে যাচ্ছে, তবে কিছু খাতে চাপ রয়েছে যা মোকাবিলায় নজর দেওয়া হচ্ছে। আগের বছরগুলোয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে যে প্রকৃত আয় কমে গিয়েছিল, চলতি অর্থবছরে সেখান থেকে ধীরে ধীরে উত্তরণের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।
কৃষি খাতে উৎপাদনের লক্ষমাত্রা অর্জন
যথাযথ প্রণোদনা ও ব্যবস্থাপনার ফলে গত অর্থবছরে বোরো ধানের ফলন হয়েছে ভালো। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় চলতি মৌসুমে আমন ধানের ফলনও সন্তোষজনক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমন ধানের উৎপাদন ১৬০ দশমিক ৯৫ লাখ টনে পৌঁছেছে।
বাকি ফসল কর্তন শেষ হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। পাশাপাশি, আউশ ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম হলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় মোট উৎপাদন ৭ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়েছে। এরফলে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে যে ভারসাম্যহীনতা ছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
ঊর্ধ্বমুখী প্রবাসী আয়
চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ৫ লাখ কর্মীর বৈদেশিক নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৯৭ হাজার। একই সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স এসেছে ১৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি।
আমদানি খাত নিয়ে আলোচনায় জানানো হয়, উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে আমদানির ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ঋণাত্মক। শিল্প খাতে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা যায়। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত
ব্যাংকিং খাতে ২০২৫ সাল ছিল ‘সংশোধনের বছর’। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি, তবু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আলোচনা অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
শিল্প, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান
রপ্তানি খাতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। পোশাক খাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা চাপ সৃষ্টি করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যদিও ঋণপ্রাপ্তি ও নীতিসহায়তা এখনো সীমিত।
রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়
২০২৫ সালে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চাপ ছিল প্রবল। করজালের সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল কর ব্যবস্থার উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি চোখে পড়েছে। উন্নয়ন ব্যয়ে গতি থাকলেও প্রকল্পের মান ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আগামীর প্রত্যাশা
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল অর্থনীতির জন্য ছিল সংকট সামলানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ার বছর। এই বছর আমাদের শিখিয়েছে-অস্থায়ী সমাধান নয়, টেকসই সংস্কারই পারে অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে। ২০২৬ সালের চ্যালেঞ্জ হবে এই সংস্কারকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করা।
বিজ্ঞাপন
DBBL Deposit Plus Scheme (DPS) ; Interest Rate 2025
No Comment Yet