বাউল সাধক দুর্বিন শাহের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী আজ

মুহাম্মদ আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ, ২ নভেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত ছাতক উপজেলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। শুধু শিল্প আর খনিজ সম্পদই নয়, এ উপজেলায় জন্ম নেয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, শিল্পীসহ অনেক গুণীজন দেশব্যাপী সুনাম অর্জন করেছেন।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় জন্ম নেয়া বাংলার মরমী সংগীতের আকাশে যে সকল নাম আলো ছড়ায়। এর মধ্যে অসাধারণ গুণের অধিকারী হলেন বাউল সাধক দুর্বিন শাহ। মরমী সাধক দুর্বিন শাহ ১৯২০ সালের ২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি শুধু একজন গীতিকার বা বাউলশিল্পী নন, তিনি ছিলেন মরমী দর্শন, আধ্যাত্মিক চিন্তা ও মানবপ্রেমের এক সাধক। তাঁর গানের কথায় ফুটে উঠেছে জীবন, মৃত্যু, স্রষ্টার সন্ধান, আত্মার পরিচয় এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

‘প্রেমশেল বিন্দিল বুকে মরি সে ব্যথায়, আমার অন্তরায় আমার কলিজায়/নির্জন যমুনার কূলে বসিয়া কদম্বতলে, বাজায় বাঁশি বন্ধু শ্যামরায়/ বন্ধু যদি হইত নদীর জল, পিপাসাতে পান করিয়া পোড়া প্রাণ করতাম শীতল। 

কালজয়ী এ গানগুলোর স্রষ্টা মরমী সাধক দুর্বিন শাহকে ‘জ্ঞানের সাগর’ বলা হয়।

‘জ্ঞানের সাগর’ খ্যাত মরমী গীতিকবি, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক দুর্বিন শাহ’র আজ জন্মদিন। এ দিনে তিনি তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমার ছাতক থানার নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন। মরমী গীতিকবি, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক দুর্বিন শাহের পিতা সফাত আলি শাহ ছিলেন একজন সুফি সাধক এবং মা হাসিনা বানু ছিলেন একজন পীরানী (পীর)। যে কারণে দুর্বিন শাহ সঙ্গীতচর্চার ক্ষেত্রে নিজ পা রিবারিক ঐতিহ্যেই বেড়ে উঠেছেন।

বিজ্ঞাপন

Anjara World Shop

তাঁর রচিত অধিকাংশ গানে সুফি ও মরমীবাদ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠলেও এসবের বাইরেও তিনি ভিন্ন মেজাজের অসংখ্য গান লিখেছেন।

শ্রেণি বিভাজন করলে এসব গানগুলোকে বাউল, বিচ্ছেদ, আঞ্চলিক, গণসংগীত, মালজোড়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, গোষ্ঠ, মিলন, রাধা-কৃষ্ণ বিষয়কক পদাবলী, হামদ-নাত, মারফতি, পীর-মুর্শিদ স্মরণ আল্লাহকে-স্মরণ, নবী স্মরণ, ওলি আউলিয়াকে স্মরণ, ভক্তিগীতি, মনঃশিক্ষা, সুফিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, কামতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব ও দেশের গান বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। এছাড়াও বিবিধ শিরোনামে তার রচিত আরো বিভিন্ন পদাবলীকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

বাউল সাধক দুর্বিন শাহ ১৯৬৭ সালে প্রবাসী বাঙালিদের আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর অন্যতম সফর সঙ্গী ছিলেন, বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিম। সেখানে দুর্বিন শাহের গানের কথা ও সুরে বিমোহিত হয়ে সঙ্গীত প্রেমীরা তাকে ‘জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সাত বছর বয়সে বাবাকে হারান এ বাউল সাধক।

১৯৪৬ সালে সুরফা বেগমের সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তার রচিত গানগুলোর কয়েকটি হল-নির্জন যমুনার কূলে বসিয়া কদম্বতলে, আমার অন্তরায় আমার কলিজায়, সুখের নিশি প্রভাত হলো উদয় দিনমণি, শমন লইয়া পিয়ন খাড়া আর কত দিন দেরি, ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু রে, পরদেশীরে দূর বিদেশে ঘর, নব যৌবন আষাঢ় মাসে, তোমার মতো দরদী কেউ নাই, বন্ধু যদি হইতো নদীর জল। বিখ্যাত এ বাউল সাধক ৫৭ বছর বয়সে ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ৩ ফাল্গুন, ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।

0%
0%
No Comment Yet