লাখো-কোটি শুকরিয়া মহান আল্লাহ তা‘আলার দরবারে, অবশেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের মাটিতে সফলভাবে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একটি আবেগে আপ্লুত জাতির দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, একটি ধারাবাহিক মুক্তির আন্দোলনের জীবন্ত স্মারক, এবং প্রবহমান গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক নতুন সূচনার দিন।
বাংলাদেশের আপামর জনতা যেভাবে তাঁকে বরণ করে নিয়েছে, তাতে স্পষ্ট, এই প্রত্যাবর্তন হৃদয়ের, এই প্রত্যাবর্তন রাজসিক নয়, বরং ঐতিহাসিক, এই প্রত্যাবর্তন মানুষের আবেগ অনুভূতি, ভালোবাসার, মানুষ মনে অজান্তেই বলছে "ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে" তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রতিটি মুহূর্তে আবেগের যে ভাষা, ভালোবাসার যে পারদ বাষ্প আমরা দেখেছি, তা ছিল নীরব অথচ গভীর থেকে গভীরতর। তিনি যে কতটা আবেগে ছিলেন তা প্রমাণ করে প্রতিটি মুহূর্তে ফেসবুকে আপডেট দেওয়া, সীমান্তে প্রবেশের মুহূর্তে ফেসবুক পোস্ট, সিলেটে অবতরণের পর পোস্ট, দেশে ফিরে আবার পোস্ট, সবকিছুই যেন বলে দিচ্ছিল, দীর্ঘ নির্বাসনের শেষে এই সফর তাঁর কাছে কতটা অনুভূতির।
লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে তাঁকে দেখেছি হাতে ব্যাগ বহন করতে। দেখেছি স্ত্রীকে ওভারকোট পরিয়ে দিতে। রাজনীতির সীমাহীন কোলাহলের বাইরে এই চমৎকার পারিবারিক, মানবিক দৃশ্যগুলোই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে নেমে তিনি খালি পায়ে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েছেন, দেশের মাটি আহ্লাদের সাথে স্পর্শ করেছেন। এই এক মুহূর্তেই যেন হাজার লক্ষ কোটি ভাষণের সারাংশ। এই স্পর্শ আত্মার স্পর্শ, নিজ জন্মভূমির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার আলেখ্য উপাখ্যান।
স্টেজে উঠে তিনি তাঁর বসার জন্য রাখা বিশেষ চেয়ারটি গ্রহণ করেননি। বসেছেন সাধারণ চেয়ারে, এই দৃশ্যটি কোনো প্রতীকী ক্ষমতার নয়, আমৃত্যু মানুষের পাশে থাকার রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। তাঁর বক্তব্যে তিনি বারবার যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা হলো : শান্তি, শৃঙ্খলা ও দেশের অগ্রযাত্রা, বলেছেন দেশের কথা, মানুষের কথা। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে বাবা শহীদ জিয়ার কণ্ঠ, মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ধরন। তাঁর কথার মাঝে কোনো প্রতিশোধের ভাষার অবস্থান ছিল, ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বান।
তিনি অকপটে বলেছেন, একজন সন্তান হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো চাওয়া ছিল অসুস্থ মায়ের পাশে থাকা, মায়ের বিছানারা পাশে অবস্থা। কিন্তু এই দেশের মানুষের জন্য, যাঁদের জন্য তাঁর মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মানুষের ভালোবাসার ঋণ শোধ করতেই তিনি আগে জনসমাবেশে এসেছেন। এই আত্মত্যাগের স্বীকারোক্তি প্রকাশ করে তারেক রহমানের স্টেটসম্যান হয়ে ওঠার প্রতিচ্ছবি।
তারেক রহমান তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্যে স্মরণ করেছেন ১৯৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। বলেছেন ১৯৭৫-এর আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের কথা। স্মরণ করেছেন ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। উচ্চারণ করেছেন ২০২৪-এর উত্তাল ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কথা, তাঁদের আত্মত্যাগ, তাঁদের রক্ত, তাঁদের বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের কথা, তাঁদের মহিমান্বিত সংগ্রামের অবারিত গল্পের কথা। বলেছেন, সদ্য নিহত শরীফ ওসমান হাদির নাম। স্মরণ করেছেন গত ১৬–১৭ বছরে গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার অসংখ্য মানুষের কথা।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যে নতুন প্রেক্ষাপট এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে রচনা করেছে, সেই রক্তের ঋণ রয়েছে। সেই ঋণ শোধ করতেই তিনি কাজ করবেন, এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং এর জন্য গণমানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন।
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বারবার মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া চেয়েছেন। বলেছেন, আল্লাহই একমাত্র পরিকল্পনাকারী, তিনিই পথনির্দেশক। তিনি পথ দেখালে তবেই আমরা সফল হব। তাঁর বক্তব্যে রাসূল করীম (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ উঠে এসেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই ন্যায়পরায়ণতা ধরে রাখার জন্য তিনি আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি স্মরণ করেছেন মার্টিন লুথার কিং-এর ঐতিহাসিক উক্তি, “I have a dream” সেই ধারাবাহিকতায় তিনি বলেছেন, “I have a plan”। আর বক্তব্যের শেষপ্রান্তে এসে উচ্চারণ করেছেন, “We have a plan for the country and the people of the country.” এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তিনি আবারও মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন।
তরুণ প্রজন্ম তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল। তিনি বলেছেন, এই তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়বে, তাঁরাই নেতৃত্ব দেবে, তাঁরাই দেশকে সামনে নিয়ে যাবে। লাখো-কোটি মানুষের ভিড়ে তিনি আনন্দ করেছেন, হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানিয়েছেন, ভালোবাসা গ্রহণ করেছেন, এটি ছিল নেতা ও জনতার পারস্পরিক সংযোগের এক অনন্য দৃশ্য।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
বিমানবন্দরে নেমেই তিনি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনুসকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, ৩০০ ফিটসহ আশপাশের এলাকা তারা নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করবেন। এটি রাজনৈতিক শিষ্টাচার, প্রজ্ঞা, সহিষ্ণুতার এক নতুন বার্তা।
রাত ছাড়িয়ে সুবহে সাদিক পেরিয়ে, প্রবল শীতকে উপেক্ষা করে সূর্যোদয় থেকে দুপুর পর্যন্ত, কুড়িল থেকে এয়ারপোর্ট রোড, এরপর জনসমুদ্র পেরিয়ে তিনশো ফিট। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। স্থিরচিত্রে যা দেখা গেছে, বাস্তবে তার চেয়েও বহু গুণ বেশি মানুষ ছিল মহাখালী থেকে উত্তরা-আব্দুল্লাহপুর হয়ে টঙ্গি পর্যন্ত, যে স্রোত তিনশো ফিটে ঢুকতেই পারেনি।
আমাদের আগামীর রাষ্ট্রনায়কের এই ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মহাসমুদ্রে এক ফোটা শিশিরকণা হতে পেরেছে যারা, তাঁরা সবাই গর্বিত। এটি এক স্মরণীয় মুহূর্ত। ঢাকার রাজপথে মানুষের অকল্পনীয় ভিড়, প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য, হৃদয় নিংড়ে ভালোবাসা ঢেলে দেওয়ার জন্য। রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে আনন্দাশ্রু, কণ্ঠে বজ্র নিনাদ, বুকে অদম্য উচ্ছ্বাস।
সবার মুখে একটাই ধ্বনি, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা এসেছেন আমাদের মাঝে।
অবশেষে বাংলাদেশ পেল নেতা।
এখন স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার গণতান্ত্রিক পথও।
লেখকঃ মাহবুব নাহিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
No Comment Yet