শিল্পের আভায় বন্ধুত্ব উদ্যাপনের গল্প
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ সময়: ১০:৩৫:২৫
শিল্পকে আশ্রয় করে ঘটেছিল তাদের পারস্পরিক পরিচয়। আর সেই শিল্পিত যাত্রার মাঝে রচিত হয় তাদের নিবিড় সম্পর্ক। চারুকলায় দীক্ষা নেওয়ার সূত্র ধরে তৈরি হয় বন্ধুত্বের বন্ধন। সময়টা ছিল ১৯৯০ সালের ৭ জানুয়ারি। সেদিন তারা সকলে মিলিত হয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্মৃতিময় সবুজ-শ্যামলে আবৃত এক আঙিনায়। শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পকলার ভুবনে। রং-তুলি, পেন্সিলসহ ছবি আঁকার নানা অনুষঙ্গকে সঙ্গী করে বসেছিলেন শ্রেণিকক্ষে।
তারা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ৪১তম ব্যাচের ১৯৮৯-৯০ ব্যাচের চারুশিক্ষার্থী। একসময় শেষ হয় তাদের শিক্ষা জীবন। তবে রয়ে যায় শিল্প সফরের মাঝে তৈরি হওয়া সেই হৃদয়ের বন্ধন। সাবেক এই চারুশিক্ষার্থীদের বন্ধুত্বের ৩৬ বছর পূর্ণ হলো বুধবার। এ উপলক্ষে চমৎকার এক উদ্যাপনের আয়োজন করা হয়েছে। ৪৪ শিল্পীর কাজ নিয়ে অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে সেজেছে বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনী।
শিল্পায়োজনটির উপলক্ষ ছিল না কোনো উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। ছিল না বক্তৃতার বাগাড়ম্বর। শুধুই ছিল অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের প্রাণের উচ্ছ্বাস। সেই উচ্ছ্বাসের মাঝে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আবির্ভূত হন এই শিল্পীদের ক্লাসের প্রথম শিক্ষক বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ও চিত্রশিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্য। তিনি এসে খুব বেশি কথা না বলে বরং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন তার ছাত্রদের কাজগুলো। ভালো কাজগুলোর প্রশংসা করার পাশাপাশি অনুপ্রাণিত করেছেন তার শিক্ষার্থী শিল্পীদের।
নানা মাধ্যমের কাজের সম্মিলন ঘটেছে এই প্রদর্শনীতে। এক সময়ের শিক্ষার্থীরা মেলে ধরেছেন তাদের শিল্পীসত্তার পরিণত রূপ। আবহমান গ্রামবাংলার রূপময়তা, নগর জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে নিসর্গের নান্দনিকতা, যাপিত জীবনচিত্র থেকে নারীর সৌন্দর্য কিংবা কম্পোজিশনের খেলায় সৃজিত ক্যানভাসগুলো সহজেই কাছে টানে শিল্পরসিককে। মূর্ত ধারার পাশাপাশি রয়েছে বিমূর্ত ও ভাবনাতাড়িত চিত্রকর্মের সমাহার। চিত্রকর্মের সমান্তরালে রয়েছে শিল্পরসিককে কাছে টানা ভাস্কর্যের সমাহার।
তেমনই এক ভাস্কর্যের শিরোনাম মোরগ। প্রদর্শনালয়ের মাঝে সাদা রঙের টেবিলের ওপর ঠাঁই পেয়েছে লাল ঝুঁটিওয়ালা দুই ডানা মেলে ধরা মোরগটি। স্বল্পরসদে অর্থাৎ কাগজ এবং তার ও নেটের সমন্বয়ে ঠোঁট উঁচিয়ে চিৎকাররত মোরগের ভাস্কর্যটি গড়েছেন ফারজানা ইসলাম মিল্কি। আলাপচারিতায় এই ভাস্কর বলেন, আমাদের ৪১তম ব্যাচের এই প্রদর্শনী কেবল শিল্পকর্ম প্রদর্শনের আয়োজন নয়; এটি এক ধরনের পুনর্মিলন। সেই অর্থে এটি বন্ধুত্বের বন্ধনকে উদ্যাপনের এক বর্ণিল শিল্পসফর। একসময় একসঙ্গে যারা শিল্প-শিক্ষার ক্লাস করতাম তারাই আজ হাজির হয়েছি নিজেদের সৃষ্ট শিল্পকর্ম নিয়ে।
আমাদের সবাই খ্যাতিমান শিল্পী হতে না পারলেও এ প্রদর্শনী প্রমাণ করে আমাদের কেউ থেমে যায়নি।
অনাদি কুমার বৈরাগীর চিত্রপটে মূর্ত হয়েছে সাজসজ্জারত নারীর সৌন্দর্য। কলস, ফুল, পাতাসহ নানা অনুষঙ্গে সেজেছে আশরাফুজ্জামান তুহিনের ক্যানভাস। ফয়জুল হোসেন সাজুর চিত্রপটে মূর্ত হয়েছে অভিব্যক্তিময় এক চোখের ছবি। বিমূর্ত রীতিতে জলের ধারার ছবি এঁকেছেন ফারহানা আফরোজ বাপ্পি। লাল-হলুদ পুষ্পশোভিত পাবর্ত্য উপত্যকার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উঠে এসেছে গোলাম ফারুকের ক্যানভাসে। ট্যাপেস্ট্রি মাধ্যমের ব্যবহার ও কম্পোজিশনের বৈচিত্র্যে ক্যানভাসে মুখচ্ছবি মেলে ধরেছেন মফিজ উদ্দীন। রকমারি রঙের আঁচড় ও সর্পিল রেখার টানে চিত্রপটে স্বপ্নিল আবহ সৃষ্টি করেছেন মনিদীপা দাসগুপ্তা। মুক্তি ভৌমিকের ভাস্কর্যে মূর্ত হয়েছে বেঞ্চিতে বসা বিশ্রামরত এক নারীর অবয়ব।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
বৈভবময় রঙের খেলায় রক্তজবার ছবি এঁকেছেন রিফাত জাহান কান্তা। রেবেকা সুলতানার আঁকা ছবিতে ভালোবাসার সুপ্ত প্রকাশ ঘটেছে নারীর মুখাবয়বে। জলজ জীবনের গল্পময় মোংলা বন্দরে চলাচলরত নৌযানের ছবি এঁকেছেন রবিউল ইসলাম। টেরাকোটা মাধ্যমের আশ্রয়ে একঝাঁক পায়রার উপস্থিতিকে বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন রেহানা ইয়াসমিন শিলা। চরাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো একপাল মহিষের ছবি এঁকেছেন সাফিন ওমর।
এভাবে প্রদর্শনীর শিল্পকর্মসমূহে চারপাশের চেনা জগতের সমান্তরালে, ব্যক্তিমানুষের একাকিত্ব ও আত্মঅনুসন্ধানের প্রতিচ্ছবি, ভাবনাতাড়িত ভুবনসহ সমকালীন নানা বিষয়ের সন্ধান মেলে। ৪৪ শিল্পীর ৮৮টি শিল্পকর্মে সজ্জিত হয়েছে এই শিল্পায়োজন। আগামী ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
No Comment Yet