শিশু পানিতে পড়লেই সাইরেন বেজে কল যাবে অভিভাবকের মোবাইলে
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬ সময়: ১০:৫৭:২৫
শিশুর গলায় ঝুলবে মাত্র দুই গ্রাম ওজনের ছোট্ট একটি ডিভাইস, যেটি অনেকটা লকেটের মতো দেখতে। কোনো কারণে যদি শিশুটি পানিতে পড়ে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠবে সাইরেন, শিশুর অভিভাবকের মোবাইল ফোনে যাবে কল। আর তখন শিশুর অভিভাবক দ্রুত গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করতে পারবেন।
অসাধারণ এই জীবন রক্ষাকারী ডিভাইসটি উদ্ভাবন করেছেন ভোলার তরুণ উদ্ভাবক মো. তাহসিন।
জানা গেছে, ২০০৭ সালে ভোলার বিচ্ছিন্ন মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট এলাকায় তার জন্ম। বাবা ক্বারী আব্দুল হালিম স্থানীয় একটি মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক। নিজের মনের অদম্য আগ্রহ আর বাবার সার্বিক সহায়তায় তাহসিন শৈশব থেকেই বিভিন্ন জিনিস উদ্ভাবন করে আসছে। এ পর্যন্ত তার ১৫টি প্রজেক্ট প্রদর্শিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক পুরস্কারও পেয়েছেন তাহসিন।
তাহসিন ২০২৪ সালে মনপুরা হাজিরহাট সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেছেন। বর্তমানে ঢাকার ডেফোডিল ইনন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল বিভাগে অধ্যয়নরত।
তাহসিন জানান, তিনি যখন একেবারেই ছোট তখন তার আপন ছোটবোন দুবার পানিতে পড়ে গিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত দুবারই তার বোন বেঁচে যায়। কিন্তু তার আপন দুই খালাতো বোন বাড়ির পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায়। পানিতে পড়ে দুই খালাতো বোনের মৃত্যুর বিষয়টি তাহসিনকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে। সে ভাবনা থেকে এ উদ্ভাবন।
প্রায় আট থেকে নয় মাস গবেষণা করে তাহসিন প্রথম উদ্ভাবন করেন ছোট্ট এই ডিভাইস। যার নাম রাখেন ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’। ডিভাইসটি শিশুর গলায় ঝুলানো থাকবে। শিশুটি যখন পানিতে পড়ে যাবে আর ডিভাইসটি পানির সংস্পর্শে আসবে তখনই ঘরে থাকা রিসিভারে সাইরেন বেজে উঠবে। সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকদের হাতে থাকা মোবাইলে কল চলে যাবে। অভিভাবক চাইলে জিপিএস এর সহায়তায় শিশুটি কোথায় পানিতে পড়েছে তার অবস্থানও জানতে পারবেন।
ডিভাইসটি উদ্ভাবন করতে এ পর্যন্ত প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তাহসিন জানান, এটা বাজারজাত করা হলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে অভিভাবকদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
তিনি জানান, ডিভাইসটি তৈরি করতে তিনি বাজার থেকে ইএসপি ৩২, জিএসএম মডিউল, ৩১৫ মেঘাহার্জের একটি ট্রান্সমিটার রিসিভার, ব্যাটারিসহ আরও কিছু জিসিনপত্র কিনেছেন।
তিনি আরও জানান, শিশুর গলায় থাকা ডিভাইসটি পানির সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে থাকা মুক্ত ইলেকট্রনগুলো সামান্য বিদ্যুৎ পরিবহণ করে সুইচের মতো কাজ করে রিসিভারে একটি সিগনাল পাঠায়। তখন সাইরেন বেজে ওঠে এবং মোবাইলফোনে কল চলে যায়।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ভোলা একটি দ্বীপ জেলা। অন্যান্য জেলা থেকে এ জেলায় পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুহার বেশি। এটি রোধ করার একটি উপযুক্ত সিস্টেম উদ্ভাবন করেছেন ভোলার ছেলে তাহসিন। তার ডিভাইসটির মাধ্যমে যদি একটি শিশুরও প্রাণ বাঁচানো যায় তাহলেই তার এ উদ্ভাবন সফল। ডিভাইসটি বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে প্রশাসনিক সব ধরনের সহায়তা করা হবে।
তাহসিনের ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে ভোলা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ভোলার চারদিকে নদীবেষ্টিত। এখানে প্রতিনিয়ত পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। আর এ মৃত্যু থেকে রক্ষায় তাহসিন যে চাইল্ড সেফটি ডিভাইস উদ্ভাবন করেছেন বিষয়টি ভালো ও প্রশংসনীয়। এটির আরও উন্নয়নের জন্য যদি কোনো সহযোগিতা লাগে তাহলে সেটি করা হবে। এটির ব্যবহারে শিশুদের অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রচারণা চালানো হবে।
এদিকে তাহসিনের বিশ্বাস তার উদ্ভাবিত ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’ ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর হার অনেক কমে আসবে। এ জন্য ডিভাইসটির উন্নয়ন সাধন এবং সম্প্রসারণে সরকারি বেসরকারি সহায়তা কামনা করছেন তিনি।
No Comment Yet