প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় অনাগত শিশুর জীবনের অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলে : হাইকোর্ট

ঢাকা, ১১ মে, ২০২৬(বাসস) : প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় জন্মের আগে বৈষম্য সৃষ্টি করে ও অনাগত শিশুর জীবনের অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলে বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট। 

গর্ভের ভ্রƒণ এর লিঙ্গ পরিচয় নির্ণয়কারী পরীক্ষা বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানের জনস্বার্থে করা রিটের শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রায় দেন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ। সে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি আজ সোমবার প্রকাশ করা হয়। 

প্রকাশিত রায়ে হাইকোর্ট বলেন, শুধু লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে জীবন ধ্বংসের সুযোগ করে দেয়, এমন যেকোনো প্রথা সুস্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক। প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় করা কন্যা শিশু নির্মূলের পথকে সহজ করে, যা অনাগত শিশুর জীবনের অধিকারকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। 

রায়ে হাইকোর্ট আরও বলেন, আল্ট্রাসোনোগ্রাফিসহ অন্যান্য রোগনির্ণয় প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় পদ্ধতির ক্রমবর্ধমান অপব্যবহার হচ্ছে। ফলে কন্যা ভ্রুণহত্যার (গর্ভপাত) মতো ঘটনা ঘটছে। যার ফলে সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য, নারীর প্রতি বৈষম্য বাড়ছে। অনাগত শিশু ও গর্ভবতী মা প্রাপ্য মর্যাদা ও জীবনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

এছাড়া রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, চিকিৎসা প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে আইনসম্মতভাবে রোগনির্ণয়। কিন্তু ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ণয়ের চিকিৎসা প্রযুক্তির অপব্যবহার পক্ষপাতমূলক গর্ভপাতকে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে তা কন্যা শিশুদের প্রতি নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে স্থায়ী করে তুলছে। 

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ অনুযায়ী চিকিৎসকদের অবশ্যই নৈতিক মান এবং চিকিৎসার বৈধ পন্থা অনুসরণ করতে হবে। চিকিৎসাবহির্ভূতভাবে লিঙ্গ নির্ণয় এবং তা প্রকাশে রোগনির্ণয়কারী সরঞ্জাম ব্যবহার করা একজন চিকিৎসকের পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য। যে কারণে ডায়াগনস্টিক ইমেজিং এবং আলট্রাসনোগ্রাফির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকা এবং নৈতিক মান মেনে চলা আবশ্যক। লিঙ্গ নির্ণয়ের জন্য এসব চিকিৎসাপ্রযুক্তির অপব্যবহার অনুমোদিত চিকিৎসা সেবার উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। বেআইনি গর্ভপাত বা জীবনহানির সুযোগ তৈরি করে এমন যেকোনো কাজ ফৌজদারি অপরাধের কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

Anjara World Shop

প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় জন্মের আগে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ আইনের চোখে সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নাকচ করে দিয়েছে। প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় জন্মের আগে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ফলে সমাজে কাঠামোগত বৈষম্য, জনতাত্ত্বিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এই ধরনের চর্চা চলতে দেওয়া লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সাংবিধানিক বিধানের পরিপন্থী। এছাড়া প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয়ের ফলে পছন্দমতো লিঙ্গ নির্বাচনের (গর্ভপাত) চর্চা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে। লিঙ্গীয় ও জনতাত্ত্বিক ভারসাম্যহীনতাকে বাড়িয়ে তোলে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্যকে ইন্ধন জোগায়। গর্ভপাতে উৎসাহিত করে। এই ধরনের চর্চা সংবিধানের ১৮, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। 

প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় গর্ভবতী নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে রায়ে আরও বলা হয়েছে যে, বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এই পদ্ধতির অপব্যবহার প্রতিরোধ বা নিষিদ্ধ করতে রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। শুধু তাই না, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশ বাধ্য। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) ও নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদে (সিডও) স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। ফলে নারী ও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষা এবং সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ করার বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের রয়েছে। প্রসবপূর্ব লিঙ্গ নির্ণয় এসব বাধ্যবাধকতাকে লঙ্ঘন করে।

এদিকে এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নিবন্ধিত হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনাগত শিশুর চিকিৎসাসংক্রান্ত একটি হালনাগাদ ডাটাবেজ করতে স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে এই নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা আদালতের পর্যবেক্ষণে রাখতে রায়ের কার্যকারিতাকে চলমান (কন্টিনিউয়াস মেন্ডামাস) রাখা হয়েছে।

0%
0%
No Comment Yet