বেলিংহামের চড় খাওয়া কে এই আর্জেন্টাইন তরুণ ফুটবলার?
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ সময়: ১৬:১৪:৩৭
২০২৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয়। কিন্তু মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর এখন যার ওপর, তিনি আর্জেন্টিনার তরুণ ডিফেন্ডার ভ্যালেন্তিন ‘এল কলো’ বার্কো।
তবে এবার কেবল মাঠের জাদুকরী পারফরম্যান্সের কারণে নয়, ম্যাচ শেষে ইংলিশ তারকা জুড বেলিংহামের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও হাতাহাতিই তাকে সংবাদ শিরোনামের শীর্ষে নিয়ে এসেছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার ঠিক পরপরই ক্যামেরায় ধরা পড়ে বার্কো ও বেলিংহামের সেই নাটকীয় মুহূর্ত, যা মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
বার্কো ঠিক কী বলেছিলেন তা স্পষ্ট না হলেও, রিয়াল মাদ্রিদ তারকা বেলিংহামের প্রতিক্রিয়া ছিল ক্ষীপ্র—তিনি বার্কোর মাথার পেছনে একটি চড় মারেন।
তরুণ বার্কোও দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বেলিংহামকে ধাক্কা মারেন, যা দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আগেই নিকোলাস ওতামেন্দি এবং আর্জেন্টিনার অন্য সতীর্থরা এসে দুজনকে আলাদা করেন এবং বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে রক্ষা করেন।
এই ঘটনাটি বার্কোর ক্যারিয়ারের শুরু থেকে চলে আসা সেই চিরচেনা রূপটিকেই আবার মনে করিয়ে দিল: তিনি যেমন প্রচণ্ড প্রতিভাবান, তেমনই মাঠে তার নির্ভীক ও লড়াকু মানসিকতা কাউকেই সহজে ছেড়ে দেওয়ার নয়।
ফুটসাল থেকে আর্জেন্টিনার জাতীয় দল
বার্কোর এই লড়াকু মানসিকতার পেছনে রয়েছে এক চরম আত্মত্যাগের গল্প। বুয়েনস আইরেস প্রদেশের এক ছোট শহর ‘২৫ দে মেয়ো’-তে জন্ম নেওয়া বার্কো প্রথমে ফুটসাল খেলে তার পায়ের জাদু রপ্ত করেন, যা পরবর্তীতে তাকে মূল ফুটবলে নিয়ে আসে।
তার প্রতিভা আর্জেন্টাইন ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের নজর কাড়তে বেশি সময় নেয়নি। ২০১৩ সালে তারা বার্কোকে তাদের একাডেমিতে যুক্ত করে। এরপর থেকেই শুরু হয় তার এক কঠিন রুটিন: ভোর ৬টায় উঠে স্কুল, আর স্কুল শেষেই বোকা জুনিয়র্সের যুব একাডেমিতে অনুশীলনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কিলোমিটার (২৫০ মাইল) আসা-যাওয়ার ক্লান্তিহীন যাত্রা।
২০২০ সালের অক্টোবরে তিনি প্রথম পেশাদার চুক্তি সই করেন এবং এর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তৎকালীন ম্যানেজার মিগুয়েল আনহেল রুসো মাত্র ১৬ বছর বয়সেই বার্কোর সিনিয়র দলে অভিষেক করান।
ক্যারিয়ারের সঙ্গে সঙ্গে বার্কোর খেলার পজিশনেও পরিবর্তন এসেছে। ১০ নম্বর জার্সি পরিহিত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে শুরু করলেও, পরবর্তীতে তিনি মাঝমাঠে খেলেন এবং একপর্যায়ে একজন অ্যাটাকিং লেফটব্যাক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে বাম প্রান্তের যেকোনো পজিশনেই খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ এক বহুমুখী প্রতিভা রয়েছে তার।
কোপা লিবার্তাদোরেস এবং ইউরোপের স্বপ্ন
২০২৩ সালের কোপা লিবের্তাদোরেসে বার্কোর আসল রূপ দেখে বিশ্ব। গোল বা অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানের চেয়েও তার খেলার ধরন, নো-লুক পাস, দুর্দান্ত ড্রিবলিং এবং মাঠের ভেতরে প্রতিপক্ষকে খেপিয়ে তোলার এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ভক্তদের মুগ্ধ করে।
ফাইনালে ফ্লুমিনেন্সের কাছে বোকা জুনিয়র্সের হারের পর, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন তাদের রিলিজ ক্লজ সক্রিয় করে বার্কোকে দলে ভেড়ায়। এই দলবদল বোকা সমর্থকদের দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছিল।
দলবদল নিয়ে বার্কো বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি ইউরোপে খেলাটাই নিজেকে বড় করার সেরা উপায় এবং এটা প্রতিটি খেলোয়াড়ের স্বপ্ন। আমি চেয়েছিলাম বোকা যেন আমার স্বত্বের একটা অংশ নিজেদের কাছে রাখে। আমরা অনেক আলোচনা করেছি, কিন্তু কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় আমরা রিলিজ ক্লজ সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিই।’
স্ত্রাসবুর্গে পুনরুত্থান, স্কালোনির ভরসা এবং চেলসি যাত্রা
ইউরোপের শুরুটা বার্কোর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ব্রাইটনে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না, এমনকি সেভিয়াতে ধারে গিয়েও চেনা ছন্দে ফিরতে পারছিলেন না তিনি।
তবে রেসিং স্ত্রাসবুর্গে যোগ দেওয়ার পর সবকিছু বদলে যায়। সেখানে তিনি নিজের সেরা ফর্ম ফিরে পান, মাঝমাঠে একজন ক্রিয়েটিভ প্লে-মেকার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন এবং তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা একটি মৌসুম পার করেন।
এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তাকে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা দলে জায়গা করে দেয়, যেখানে তাকে আলবিসেলেস্তেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তার এই পারফরম্যান্স ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে।
অবশেষে ক্লাব ফুটবলের দলবদল বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিজিও রোমানো নিশ্চিত করেছেন যে, বার্কো চেলসিতে যোগ দিচ্ছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা নামার পরপরই স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে শুরু হবে বার্কোর নতুন অধ্যায়, যেখানে বিশ্ব ফুটবলের সেরাদের তালিকায় নিজের নাম লেখাতে প্রস্তুত এই আর্জেন্টাইন তরুণ।
সূত্র: মার্কা
No Comment Yet