বাবার কাঁধে ছেলে, ছেলের চোখে মেসি

বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি অনেক সময় তৈরি হয় গ্যালারিতে। একজন বাবার কাঁধে বসে আছে ছোট্ট একটি ছেলে। দু’হাতে বাবার মাথা শক্ত করে ধরে রেখেছে। তার চোখ মাঠে। বিস্ময়ে ভরা। হঠাৎ সে আঙুল তুলে চিৎকার করে ওঠে, ‘বাবা, দেখো… মেসি!’

মেসি অনেক দূরে। সবুজ ঘাসের ওপর ছোট্ট একটি বিন্দু। সেই শিশুর কাছে তিনিই পুরো পৃথিবী। বাবা মৃদু হেসে ছেলের পা দুটো আরও শক্ত করে ধরে রাখেন। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আরেকটি বিশ্বকাপ। তখন তিনিও এমনই ছোট ছিলেন। নিজের বাবার কাঁধে বসে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার চোখ খুঁজেছিল ম্যারাডোনাকে। সময় বদলেছে। নায়ক বদলেছে। বদলায়নি বাবার কাঁধ। বিশ্বকাপ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্বপ্ন পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উৎসব।

গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে আছেন তিন প্রজন্ম। দাদার গায়ে পুরোনো জার্সি। বাবার গায়ে আরেক যুগের। ছেলের গায়ে নতুন নায়কের নাম। জার্সি আলাদা। আবেগ এক।

জাতীয় সংগীত বাজতেই সবাই উঠে দাঁড়ান। কেউ চোখ বন্ধ করেন। কেউ পতাকা বুকে চেপে ধরেন। ছোট্ট ছেলেটি জাতীয় সংগীতের সব শব্দ জানে না। বাবার দিকে তাকিয়ে সেও গুনগুন করে। ভালোবাসা এভাবেই শেখা যায়।

খেলা শুরু হয়। একটি আক্রমণে বাবা সামনে ঝুঁকে পড়েন। ছেলেও ঝুঁকে পড়ে। একটি শটে দু’জনের বুক একসঙ্গে কেঁপে ওঠে। গোল হলে দু’জন একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে। সেই মুহূর্তে বাবা আর ছেলে নয়, তারা দু’জনই সমর্থক। ফুটবল বয়সের দূরত্ব মুছে দেয়। শিশুরা বিশ্বকাপ দেখে বিশ্বাস নিয়ে। তাদের কাছে প্রিয় দল কখনো হারে না। প্রিয় ফুটবলার কখনো ভুল করে না। তারা জানে না অফসাইড কী। জানে না কৌশল কী। তারা শুধু জানে, বল জালে জড়ালেই পৃথিবীটা আরও সুন্দর হবে।

বড়দের কাছে প্রতিটি ভুল পাসে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। প্রতিটি ট্যাকলে বুক ধড়ফড় করে। যদি দল জিতে,বাবা ছেলেকে কাঁধ থেকে নামিয়ে জড়িয়ে ধরেন। শিশুটি আনন্দে লাফায়। বাবা চুপচাপ আকাশের দিকে তাকান। তার চোখের কোণে জমে ওঠে জল। সেই জল জয়ের নয়, সময়ের। এই মুহূর্ত একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে।

আর যদি দল হেরে যায়? শিশুটি চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর আস্তে করে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, আমরা হারলাম কেন?’ বাবা উত্তর দিতে পারেন না। বহু বছর আগে তিনিও নিজের বাবাকে একই প্রশ্ন করেছিলেন। সেই প্রশ্ন আজও বদলায়নি। বাবা ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘সব সময় জেতা যায় না বাবা। আবার বিশ্বকাপ আসবে।’

চার বছর একটি শিশুর কাছে অনেক দীর্ঘ সময়। একজন বাবার কাছে নয়। বাবা জানেন, পরের বিশ্বকাপে ছেলেটা আরও লম্বা হবে। আর কাঁধে বসবে না। একদিন বাবার হাত ছেড়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখতে যাবে। সময়ের এটাই নিয়ম। কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়।

একদিন সেই ছেলেটিই বাবা হবে। তার কাঁধেও বসবে আরেকটি ছোট্ট শিশু। মাঠে তখন মেসি থাকবেন না। থাকবে নতুন কোনো কিশোর। শিশুটি আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করবে, ‘বাবা, ও কে?’ বাবা একটু হেসে বলবেন, ‘আজ যাকে দেখছিস, একদিন তোর ছেলেও তার গল্প শুনবে।’ এভাবেই ফুটবল বেঁচে থাকে। একজন বাবার গল্পে। একজন সন্তানের বিস্ময়ে। একটি পুরোনো জার্সিতে। একটি ছবিতে। একটি আলিঙ্গনে।

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়। ট্রফি এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়। নায়ক বদলায়। প্রজন্ম বদলায়। শুধু বদলায় না একটি দৃশ্য।

গ্যালারিতে একজন বাবার কাঁধে বসে থাকা ছোট্ট একটি শিশু। যার চোখে ফুটবল মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আর একজন বাবার চোখে সেই স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

0%
0%
No Comment Yet