গোয়াইনঘাটে দেশি মাছের চরম আকাল : চড়া দামে ফিসারির মাছই ভরসা
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়: ০৯:১৯:৩৪
সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে বিগত তিন বছর ধরে প্রত্যাশিত বন্যা ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দেখা দিয়েছে দেশী মাছের চরম আকাল।
একসময় হাওর, বিল ও নদী-নালায় দেশী প্রজাতির মাছে ভরপুর থাকলেও, বর্তমানে স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে দেশী মাছের সরবরাহ প্রায় তলানিতে। এতে যেমন আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি হচ্ছে সামান্য কিছু মাছ, তেমনি কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের মেঘালয় ঘেঁষা গোয়াইনঘাটে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও বন্যা দেখা যায়। ঢলের পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে উপজেলার পিয়াইন, ডাউকি, সারি নদীসহ বিভিন্ন হাওর ও বিল। মূলত বন্যার পানিতেই প্রাকৃতিকভাবে কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুঁটি, বোয়াল, শোল, টাকিসহ নানা প্রজাতির দেশী মাছের প্রজনন ঘটে এবং হাওরগুলোতে মাছের বিস্তার ঘটে। কিন্তু এবছর উল্লেখযোগ্য বন্যা বা পাহাড়ি ঢল না আসায় এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে জলাশয়গুলোতে পানি কম। পানি না থাকায় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিনে গোয়াইনঘাট সদর, সালুটিকর, রাধানগর ও জাফলংয়ের বিভিন্ন স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও দেশী মাছের দেখা মেলা ভার। দু-একজনের দেশী মাছ নিয়ে বাজারে উঠলেও তার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের একেবারেই বাইরে। ফলে বাধ্য হয়ে ক্রেতাদের চাষের পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া ও কার্প জাতীয় মাছের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাও আবার চড়া দামে কিনতে ক্রেতাদের।
গোয়াইনঘাট সালুটিকর বাজারের এক ক্রেতা জানান, “বন্যার সময় আমরা কম দামে প্রচুর হাওরের দেশী মাছ কিনতাম। কিন্তু এবার বন্যা না হওয়ায় দেশী মাছ চোখেই দেখা যাচ্ছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম এত চড়া যে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তা কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই।”
এদিকে শুকিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ বিল বাদাল কুড়ি খাড়া। পানির অভাবে বোরো ধান কাটার পর জমিতে ফেলে রাখা নাড়া (নেরা) পচছে না। খরায় মাটি শক্ত হয়ে থাকায় পরবর্তী ফসল আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হবে কৃষকদের।
মাছের এই আকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উপজেলার হাওরপাড়ের জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ। বর্ষা মৌসুমে উন্মুক্ত জলাশয়ে জাল ফেলে যে আয় হতো, তা দিয়েই তাদের সংসার চলত। চলিতাবাড়ী হাওর এলাকার এক জেলে আক্ষেপ করে বলেন, “বন্যা না হওয়ায় হাওর-বিলে পানি নাই। সারাদিন জাল বাইয়াও আধা কেজি মাছ ধরতাম পারি না। সংসার চালাইমু কেমনে, সেই চিন্তায় রাইতে ঘুম ধরে না।
সচেতন মহলের দাবী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়তো সাময়িক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, কিন্তু দেশের জলাশয়গুলোতে নীরবে এক স্থায়ী ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে সর্বনাশা ‘চায়না দুয়ারী’ জাল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যা, খরা বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রকৃতির যতটা না ক্ষতি করে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে নিষিদ্ধ এই জাল। এটি শুধু মাছ ধরছে না, বরং দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার একেবারে সমূলে বিনাশ করছে।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
এদিকে শুকিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ‘বিল বাদাল’। পানির অভাবে বোরো ধান কাটার পর জমিতে ফেলে রাখা নাড়া (নেরা) পচছে না। খরায় মাটি শক্ত হয়ে থাকায় পরবর্তী ফসল আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হবে কৃষকদের।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুর রহমান জানান, বন্যা না হওয়া এবং দীর্ঘ সময় বৃষ্টিপাতের অভাবে উন্মুক্ত জলাশয়ে পানি না থাকায় প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এটি প্রকৃতিগত সমস্যা,জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে দেশী মাছের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে উপজেলার বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে ও বিলে মাছের পোনা অবমুক্ত করাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান ।
No Comment Yet