বনভূমি ধ্বংসের ঘটনায় আর্মেনিয়া-আজারবাইজান শান্তি প্রচেষ্টা চ্যালেঞ্জের মুখে

ঢাকা, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস) : আর্মেনিয়ার শিকাহোগ প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার একটি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে স্থানীয় কর্মকর্তা মারাত হারুতিউনিয়ান দেখালেন, আজারবাইজানের সামরিক বাহিনীর তৎপরতায় কীভাবে বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

আর্মেনিয়ার অভিযোগ, সামরিক বাহিনীর চলাচল ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বন কেটে ফেলার কারণে বিরল বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

বনভূমির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের এই বিরোধ দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও একাধিক যুদ্ধের পর স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার পথে নতুন করে গভীর উত্তেজনার বিষয়টি সামনে এনেছে।

২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সামরিক অগ্রযাত্রার সময় আজারবাইজান দুই দেশের সীমান্তবর্তী শিকাহোগ প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার কিছু অংশ দখলে নেয়।

২০২৩ সালে নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চল আর্মেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকে পুনর্দখল করে আজারবাইজান। এর পর ওই অঞ্চল থেকে প্রায় ১ লাখ জাতিগত আর্মেনীয় বাসিন্দা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

এরপর দুই দেশ স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে একটি শান্তিচুক্তির প্রাথমিক খসড়ায় সম্মত হয় দুই পক্ষ। এটিকে চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল।

তবে দুই দেশের রাজধানীতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা চললেও আর্মেনিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সিউনিক অঞ্চলের গ্রামগুলোতে এখনো আতঙ্ক কাটেনি।

কাছাকাছি আজারবাইজানের সামরিক অবস্থান এবং স্থলমাইন থাকার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকায় গত ১৫ বছর ধরে কাজ করা ৩৫ বছর বয়সী জীববিজ্ঞানী হারুত আগাতেলিয়ান বলেন, ‘এখানকার পুরো এলাকাই সরাসরি শত্রুপক্ষের নজরদারির মধ্যে রয়েছে।’

তিনি জানান, বনাঞ্চলে প্রায়ই এমন মৃত প্রাণী পাওয়া যায়, যাদের পা স্থলমাইন বিস্ফোরণে উড়ে গেছে। বনজুড়ে এসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ

এলাকার একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আজারবাইজানের সামরিক বাহিনী সেখানে চলাচল ও রসদ সরবরাহ সহজ করতে প্রশস্ত বনপথ নির্মাণ করছে।

শ্রাশেন গ্রামের ওপরের পাহাড়ি এলাকায় শরতের বনভূমির মধ্য দিয়ে নতুন সড়ক তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার দিকে যাওয়ার পুরোনো পথটিতে বসানো হয়েছে পুলিশের তল্লাশিচৌকি।

পাহাড়ের চূড়ায় আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের পতাকা দেখা যায়। দুই দেশের সামরিক অবস্থান কোথাও কোথাও মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে।

আর্মেনীয় কর্মকর্তা হারুতিউনিয়ানের দাবি, আজারবাইজানের সামরিক অগ্রযাত্রার ফলে নেরকিন-হান্দ নামের একটি গ্রাম তিন দিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়েছে। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আজারবাইজানের সেনারা প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার ২ হাজার ৭০০ হেক্টরের বেশি জমি এবং কয়েকশ হেক্টর কৃষিজমি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘তারা নির্বিচারে সবকিছু কেটে ফেলছে। কোনো প্রজাতি বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে কি না, তা-ও যাচাই করছে না।’

তিনি আর্মেনিয়ার বিপন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের সরকারি তালিকার কথা উল্লেখ করেন।

ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক সম্মেলন কপ-১৭ আয়োজনের সময় আর্মেনিয়া বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছে। এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় বৈশ্বিক উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন।

- ব্যাপক মাত্রার পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড -

বিজ্ঞাপন

Shwapno Super Shop

আর্মেনিয়ার ভূখণ্ড দখলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে আজারবাইজান। দেশটির বক্তব্য, ওই এলাকায় দুই দেশের সীমান্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।

১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শিকাহোগ প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার আয়তন প্রায় ১২ হাজার ৪০০ হেক্টর। এখানে রয়েছে ওক ও বিচগাছের বন, প্লেন গাছের বাগান এবং বিপন্ন প্রজাতির ইউ গাছ।

এ ছাড়া এই বনাঞ্চলে ককেশীয় চিতাবাঘ, বাদামি ভালুক ও বেজোয়ার ছাগলের মতো বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে।

স্থানীয় কর্মকর্তা হারুতিউনিয়ানের আশঙ্কা, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং বিভিন্ন নির্মাণকাজের কারণে ভূমিধস, কাদামাটির প্রবাহ ও পাথরধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং স্থলমাইনের কারণে সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা।

বন বিশেষজ্ঞ আয়সের গাজারিয়ান বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ কেউ জানে না।’

স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে তিনি জানিয়েছেন, প্রায় ৯০ হেক্টর এলাকায় মাটি কাটা ও অন্যান্য নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ হেক্টর বনভূমি রয়েছে। এ ছাড়া আনুমানিক ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার ঘনমিটার কাঠ কাটা হয়েছে।

তিনি এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘ব্যাপক মাত্রার পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতায় হুমকির মুখে গ্রামবাসীর জীবন-জীবিকা

কৃষিজমি ও পশুচারণের জায়গা হারানোয় স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকাও সংকটের মুখে পড়েছে।

২৬ বছর বয়সী মুরাজ আরজুমানিয়ান বেকার। তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন। ধাতুবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি আর্মেনীয় সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এখানে যখন কোনো নিরাপত্তা নেই, তখন কীভাবে সংসার শুরু করব, কীভাবে সন্তান নেব?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সন্তান এখানে বড় হবে, বাড়ির উঠানে খেলবে, ছোটাছুটি করবে—আর সব সময় কারও নিশানার মধ্যে থাকবে; এমনটা আমি কল্পনাও করতে পারি না।’

শিকাহোগ গ্রামের স্কুলে এখন মাত্র একজন শিক্ষার্থী রয়েছে।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁরা এখন আর স্বজনদের কবর জিয়ারত করতেও যেতে পারেন না।

এলাকার পৌর প্রশাসন বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য বিনা মূল্যে বাসের ব্যবস্থা করেছে। যারা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন, তারা একদিন আবার ফিরে আসবেন—এমন আশাও করছে স্থানীয় প্রশাসন।

তবে জীববিজ্ঞানী আগাতেলিয়ান গ্রাম ছেড়ে যেতে রাজি নন। তিনি বাড়িতে খরগোশ পালন করেন এবং বংশপরম্পরায় তাঁর পরিবারের বসবাসের এই গ্রামেই থাকতে চান।

তিনি বলেন, ‘বনের মধ্যেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এই বনকে আমি ভালোবাসি।’

0%
0%
No Comment Yet