শ্রীলঙ্কায় যুদ্ধের বিধবা নারীদের নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে দীর্ঘ অপেক্ষা

বাট্টিকালোয়া (শ্রীলঙ্কা), ১ নভেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : গির্জার বাইরে বসে হাতে লেখা চার পৃষ্ঠার একটি তালিকা থেকে একে একে নাম পড়ে শোনান সারধাদেবী থাদচানামূর্তি। তালিকায় রয়েছে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ১২৪ জন স্বামী, বাবা ও ভাইয়ের নাম।

ষাটের কোঠায় বয়সী তামিল এই নারী এরপর একটি প্ল্যাকার্ড হাতে তুলে নেন। আরও তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় ব্যস্ত শহর বাট্টিকালোয়ার সড়কে শুরু করেন ‘ন্যায়বিচারের দাবিতে পদযাত্রা’। এটি তাদের টানা ১ হাজার ৬০৪তম দিনের প্রতিবাদ কর্মসূচি।

১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংখ্যালঘু তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের যুদ্ধ চলে। এ সময় দেশটি ভয়াবহ সংঘাতে বিপর্যস্ত হয়।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধে বহু বেসামরিক নাগরিকসহ এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হন।

এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী অথবা লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) সদস্যদের হাতে কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, অপহৃত হন, নির্যাতনের শিকার হন কিংবা নিহত হন।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার ১৫ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের অধিকাংশের পরিণতি আজও অজানা।

অভিযোগ, আদালতে আবেদন, প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সরকারের বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি—কোনো কিছুতেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

‘আর কখনো দেখিনি ’

থাদচানামূর্তির জীবনের গল্পে উঠে এসেছে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং স্বজনদের পরিণতি জানতে পরিবারের দীর্ঘ লড়াইয়ের চিত্র।

১৯৯২ সালের জুলাইয়ে তার ৩৪ বছর বয়সী স্বামী নাল্লাথাম্বিকে নিজের জমিতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মাথায় গুলি করা হয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এক সেনাসদস্য তাকে হত্যা করেছিলেন। স্বামীকে হারানোর পরপরই ওই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন তিনি।

থাদচানামূর্তি বলেন, ‘তারা আমাকে বলেছিল, ‘আপনি যদি বলেন আপনার স্বামীকে একজন সেনাসদস্য হত্যা করেছেন, তাহলে তারা কখনোই তার মরদেহ আপনাকে ফেরত দেবে না।’

তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে বাধ্য হই। স্বামীর মরদেহ উদ্ধার করি এবং ৫০ হাজার রুপি (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ১৫১ ডলার) ক্ষতিপূরণ পাই। এরপর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।’

২০০০ সালের জানুয়ারিতে তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে নাভানিথান নিখোঁজ হন। থাদচানামূর্তির ধারণা, তামিল বিদ্রোহীরা নিজেদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে  তাকে অপহরণ করেছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি তাকে আর কখনো দেখিনি। ২০১৬ সালে কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়ে আবেদন করি। তারা জানায়, তার পরিণতি অজানা। আমাকে শুধু নিখোঁজ হওয়ার একটি সনদ দেওয়া হয়েছিল—সত্যটা নয়।’
লক্ষ্মী সিলভার অভিজ্ঞতাও খুব একটা ভিন্ন নয়।

১৯৯০ সালের জুলাইয়ে বাসে করে কলম্বো যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন  তার স্বামী। একটি তল্লাশিচৌকিতে সশস্ত্র ব্যক্তিরা  তাকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়।

লক্ষ্মী বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাকে জানিয়েছিলেন, তারা ‘টাইগার’ ছিল।’ তিনি তামিল বিদ্রোহীদের বোঝাতে এ শব্দ ব্যবহার করেন।

পুলিশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে তার করা আবেদনের কোনো জবাব মেলেনি। যাদের কাছে তিনি গিয়েছিলেন, তারা ঝামেলা না করার পরামর্শ দেন।

১৯৯৪ সালে একজন ম্যাজিস্ট্রেট তার স্বামীর মৃত্যু সনদ দেন। সেখানে মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল ‘অজ্ঞাত’। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

লক্ষ্মী সিলভা স্বীকার করেন, ‘এখন আর মনে করি না, তিনি ফিরে আসবেন।’ ষাটের কোঠায় বয়সী এই নারী এখন জীবনের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ‘এখন আমি শুধু সন্তানদের জন্য বেঁচে আছি।’

তবে অন্যরা এখনো নীরবতা মেনে নিতে রাজি নন।

৬১ বছর বয়সী রাজেশ্বরী চিথিরাভাদিভেল বলেন, ‘আমি সব সময় আশায় বুক বেঁধে থেকেছি।’

বিজ্ঞাপন

Shwapno Super Shop

তার ঘরের দেয়ালে কয়লা দিয়ে আঁকা গোঁফওয়ালা এক হাস্যোজ্জ্বল পুরুষের প্রতিকৃতি ঝুলছে। ছবিতে লোকটিকে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মাঝখানে দেখা যায়। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেনাকাটা করতে গিয়ে মুখোশধারী ব্যক্তিদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন তার স্বামী।

১৯৯৮ সালে কর্তৃপক্ষ তাকে স্বামীর মৃত্যু সনদ দেয়। এর দুই বছর পর রেড ক্রস তার কাছে একজন পুরুষের মরদেহ নিয়ে আসে শনাক্ত করার জন্য। সংস্থাটি জানায়, মরদেহটি তার স্বামীর হতে পারে।

রাজেশ্বরী বলেন, ‘মরদেহটি চেনার উপায় ছিল না। তাই এখনো আমি বিশ্বাস করি, তিনি বেঁচে আছেন।’

এ ধরনের ঘটনার বিচার ও স্বজনদের পরিণতি জানতে নারীরা প্রতিদিন প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই আন্দোলন আর্জেন্টিনার ‘মাদার্স অব দ্য প্লাজা দে মায়ো’ সংগঠনের কথা মনে করিয়ে দেয়। দেশটির ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালের স্বৈরশাসনামলে নিখোঁজ হওয়া সন্তানদের পরিণতি জানতে সংগঠনটির সদস্যরা বছরের পর বছর রাজপথে মিছিল করেছিলেন।

‘এক গভীর নীরবতা’

নিয়মিত পদযাত্রায় অংশ নেওয়া এবং আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সরলা ইমানুয়েল বলেন, ‘আমরা  আশা করেছিলাম, হাজার হাজার মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি—এখনো এক গভীর নীরবতা বিরাজ করছে।’
২০০৯ সাল থেকে শ্রীলঙ্কার নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং জাতিসংঘ বারবার দেশটির পরবর্তী সরকারগুলোর প্রতি যুদ্ধকালীন অপরাধের তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

২০২৪ সালে অনুরা কুমারা দিশানায়েকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়।

নির্বাচনী ইশতেহারে দেশটির প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম ও হামলার’ তদন্ত এবং একটি স্বাধীন জাতীয় প্রসিকিউটর দপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তবে দুই বছর পর কিছু অগ্রগতি হলেও দায়মুক্তির অবসান ঘটানোর জরুরি প্রয়োজন পূরণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে সেপ্টেম্বরে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

প্রস্তাবিত স্বাধীন প্রসিকিউটর দপ্তর নিয়ে এএফপির প্রশ্নের জবাব দেয়নি শ্রীলঙ্কার আইন মন্ত্রণালয়।

তামিল বিরোধী দলের সংসদ সদস্য রাসামানিক্কাম আর. শানাক্কিয়ান বলেন, ‘এক-দুটি আলোচিত মামলায় কিছু তদন্ত হচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু জোরপূর্বক গুম কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।’

তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সরকারগুলো কোনো পদক্ষেপ নিতে ভয় পায়।’ তার মতে, এর অন্যতম কারণ দেশটির অধিকাংশ মানুষ সিংহলি বৌদ্ধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক।

তিনি আরও বলেন, ‘তারা জানে, এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত তাদেরই ভোগ করতে হবে।’

‘জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন’

নিখোঁজদের পরিণতি নির্ধারণ ও অনুসন্ধানের জন্য ২০১৮ সালে সরকার ‘অফিস অন মিসিং পারসন্স’ (ওএমপি) প্রতিষ্ঠা করে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের নথিতে বর্তমানে ২২ হাজার মামলা নথিভুক্ত রয়েছে। যদিও জাতিসংঘের মতে, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় এক লাখের মতো।

তবে গত তিন বছরে সংস্থাটি মাত্র ২৪ জন ব্যক্তির সন্ধান মেলাতে পেরেছে।

ওএমপির সদস্য মিরাক রাহিম স্বীকার করে বলেন, ‘যে পরিবারগুলো দুই বা তিন দশক ধরে অপেক্ষা করছে, তাদের জন্য এই কাজের গতি যে অত্যন্ত ধীর তা স্পষ্ট।’

তিনি আরও বলেন, ‘এত বছর পর সাক্ষী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বহু নথি হারিয়ে গেছে এবং মানুষের স্মৃতিও অস্পষ্ট হয়ে এসেছে।’

ক্লান্ত হলেও নিজের দাবিতে অটল সারধাদেবী থাডকানামুর্তি পদযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

0%
0%
No Comment Yet