ইরানে বিক্ষোভে নিহত  বেড়ে ২০০০

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, তার দেশ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। ওয়াশিংটন যদি পরীক্ষা করতে চায় তবে তার দেশ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত আছে। ইরানে চলমান বিক্ষোভ পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ইরানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চুয়াল দূতাবাস দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে জরুরি সতর্কতা জারি করে অবিলম্বে ইরান ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী বিক্ষোভে অন্তত দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য উভয়েই রয়েছেন। মঙ্গলবার ইরানের এক কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ৬৪৬। অন্যদিকে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট নিহতের সংখ্যা ১৩ হাজারের বেশি বলে দাবি করেছে। এদিকে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি বাড়ি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা গোপনে ওই বাড়িগুলোতে লুকিয়ে রেখেছিল। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সির।
মঙ্গলবার আলজাজিরা আরবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি বলেন, চলমান অস্থিরতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, তার দেশ সকল বিকল্পের জন্য প্রস্তুত। গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের তুলনায় ইরানের এখন বড় এবং ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে। রবিবার ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর তার এই মন্তব্য সামনে এলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন যে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের অব্যাহত দমন-পীড়ন চললে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে হস্তক্ষেপ করবে। সেক্ষেত্রে তারা শক্তিশালী বিকল্প বিবেচনা করছে।

যার মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। প্রথমে এই বিক্ষোভ ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ও জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়ানোর জন্য হলেও পরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। সম্প্রতি মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হস্তক্ষেপে ভেনিজুয়েলার বামপন্থি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের নির্দেশ দেওয়া ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য একটি বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে বৈঠকের আগে যা ঘটছে তার কারণে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। 
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চুয়াল দূতাবাসের সতর্কবার্তায় বলা হয়, ইরানজুড়ে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠতে পারে। যার ফলে গ্রেপ্তার, হতাহত হওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। সতর্কবার্তায় আরও জানানো হয়- ইরান সরকার মোবাইল, ল্যান্ডলাইন ও জাতীয় ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার সীমিত করায় যোগাযোগে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ইরানে ভ্রমণ পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠেছে বলে জানানো হয়। একাধিক এয়ারলাইনস ইরানে আসা ও যাওয়ার ফ্লাইট সীমিত বা বাতিল করেছে। দূতাবাস জানায়, কয়েকটি সংস্থা ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে।

মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে দূতাবাস পরামর্শ দিয়েছে, সম্ভব হলে স্থলপথে আর্মেনিয়া বা তুরস্ক হয়ে ইরান ত্যাগ করতে।  সতর্কবার্তায় স্পষ্টভাবে বলা হয়, এখনই ইরান ছাড়ুন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে ইরান ছাড়ার পরিকল্পনা তৈরি করুন। এছাড়া যারা ইরান ছাড়তে পারছেন না তাদের জন্য নিরাপদ স্থানে অবস্থান, পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিক্ষোভ এড়িয়ে চলা এবং আশপাশের পরিস্থিতির প্রতি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বৈত নাগরিকদের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে দূতাবাস জানায়, ইরান সরকার দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না এবং তাদের কেবল ইরানি নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে দ্বৈত নাগরিকদের ইরানি পাসপোর্টে দেশ ত্যাগ করতে হবে। 
ইরানি এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর পেছনে সন্ত্রাসীরা দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ নাগরিক আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি তিনি। চরম অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ গত তিন বছরের মধ্যে ইরানের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত বছর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে ইরান যখন তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে, ঠিক তখনই দেশটিতে এই গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা দেশটির ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এই বিক্ষোভ দমনে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে। একদিকে তারা অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সৃষ্ট বিক্ষোভকে বৈধ বলে অভিহিত করছে, অন্যদিকে রাজপথে কঠোর নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে। বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইন্ধন রয়েছে দাবি করে তেহরান বলছে, নামপরিচয়হীন সন্ত্রাসীরা এই আন্দোলনকে ছিনতাই করেছে।

বিজ্ঞাপন

Shwapno Super Shop

ইরানের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধার করা সরঞ্জামের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক ডিভাইস রয়েছে, যা বিক্ষোভের নামে সহিংস কর্মকা-ে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল বলে তাদের ধারণা। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, বিক্ষোভকারীদের নির্দেশনা দিতে বিদেশ থেকে দেওয়া কলের অডিও রেকর্ডিং সরকারের হাতে রয়েছে। তার দাবি, এসব কণ্ঠস্বর দেশের বাইরে থেকে আন্দোলনকারীদের উসকানি ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল। 
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এসব দাবি সামনে এলো। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে এরই মধ্যে দেশটির কর্তৃপক্ষ বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে মার্কিন হামলার আশঙ্কাও বাড়ছে। তবে ইরানি ক্ষমতাসীনরা পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, যে কোনো ধরনের বিদেশি আক্রমণ রুখে দিতে তারা প্রস্তুত। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে ব্যবহারের জন্য বিস্তৃত গোপন ও সামরিক সরঞ্জাম সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিভাগের দুই কর্মকর্তা বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জন্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা একটি বিকল্প। তবে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সাইবার অপারেশন এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রচার প্রতিক্রিয়াও উপস্থাপন করেছেন। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল হোয়াইট হাউসে ইরানে হামলার জন্য বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি বৈঠক করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প নিজে উপস্থিত থাকবেন কিনা তা স্পষ্ট নয়।

0%
0%
No Comment Yet