এক ব্যক্তির নামে থাকা সিমের সংখ্যা কমানোর ব্যাপারে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সময়: ০০:২৮:৩৯
নির্বাচনকে সামনে রেখে মোবাইল ফোনের সিমকার্ড ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহারের প্রবণতা ঠেকাতে ধাপে ধাপে এক ব্যক্তির নামে থাকা সিমের সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০টি থেকে কমিয়ে ৫ বা ৭টি করা হবে, পরবর্তী সময়ে তা সর্বোচ্চ ২টিতে নামিয়ে আনার চিন্তাও রয়েছে।
বাংলাদেশে সিম ব্যবহারের হার বিশ্বে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিম ব্যবহারে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। এই তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশও। অতিরিক্ত সিম ব্যবহারের পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অবৈধ নিবন্ধনের বিষয়টি। রাস্তাঘাটে সিম কেনার সময় কিছু অসাধু বিক্রেতা গ্রাহকের অজান্তেই বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে অতিরিক্ত সিম নিবন্ধন করছেন। বিটিআরসির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন গ্রাহক একদিনেই দুইটির বেশি সিম কিনছেন, যা স্বাভাবিক নয়।
বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবরে দেশে মোট মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৭৯ লাখ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক গ্রামীণফোনের, এরপর রয়েছে রবি, বাংলালিংক ও টেলিটক। গত এক দশকে দেশে সিম ব্যবহারকারী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১৩ কোটির কিছু বেশি, সেখানে ২০২০ সালেই তা ১৭ কোটিতে পৌঁছায়।
সিমের অপব্যবহার ঠেকাতে ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। গত আগস্টে বিটিআরসি ঘোষণা দেয়, এক ব্যক্তির নামে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত সিম বাতিল বা মালিকানা পরিবর্তন করতে হবে। সংস্থার তথ্যমতে, দেশে মোট নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ২৬ কোটির বেশি হলেও সক্রিয় রয়েছে প্রায় ১৯ থেকে ২০ কোটি। আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৬৭ লাখ গ্রাহকের নামে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম ছিল। এর মধ্যে গত তিন মাসে প্রায় ১৫ লাখ সিম স্বেচ্ছায় বাতিল করা হয়েছে। বাকি সিমগুলো নির্ধারিত সময়েও বাতিল না হওয়ায় সেগুলো অপারেটরদের মাধ্যমে বন্ধ করা হবে।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডি-রেজিস্ট্রেশন না করা হলে সংশ্লিষ্ট সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করা হবে। পাশাপাশি ১ জানুয়ারি থেকে নতুন করে সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির নামে সর্বোচ্চ পাঁচটির বেশি সিম অনুমোদন দেওয়া হবে না। বর্তমানে দেশের প্রায় ৬ কোটি ৭৬ লাখ গ্রাহকের হাতে ১৮ কোটির বেশি সিম রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ গ্রাহকের নামে ১ থেকে ৫টি সিম থাকলেও প্রায় এক কোটি ২০ লাখ গ্রাহকের কাছে রয়েছে ৬ থেকে ১০টি সিম।
নতুন এই সিদ্ধান্তে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে। কেউ মনে করছেন, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাদের জন্য সিম নিবন্ধন আরও কঠিন হয়ে যাবে। আবার কেউ বলছেন, পরিবারের সদস্যদের আলাদা এনআইডি থাকলে মোট সিমের সংখ্যা যথেষ্টই থাকবে।
অন্যদিকে মোবাইল অপারেটররা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, শুধু সিমের সংখ্যা কমালেই অপরাধ কমে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। অপারেটরদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সরকারের রাজস্বও কমতে পারে। বিশেষ করে ছোট অপারেটরগুলো, যারা মূলত দ্বিতীয় বা তৃতীয় সিমের গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল, তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিটিআরসি জানিয়েছে, আইওটি ডিভাইসের জন্য আলাদা নিবন্ধনের মাধ্যমে বিশেষ সিরিজের সিম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনপূর্ব সময়ে সিমের অপব্যবহার রোধ করতেই এই কঠোর নীতিতে যাচ্ছে সরকার।
No Comment Yet