হাসিনার কথিত পুত্র সুধির নন্দী: ডেভিল হান্টেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রকাশ্যে
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সময়: ০৩:০৯:৪২
গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাউফলে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানের ভয়ে আত্মগোপনে চলে যান। তবে তাদের মধ্যে অনেকে আবার এলাকায় ফিরে এসেছেন। প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে নিরবতা পালন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রভাবশালী কোনো মহলের ইশারায় অথবা প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা এলাকায় ফিরে এসেছেন—এমন গুঞ্জন রয়েছে। এদের মধ্যে আলোচিত একজন হলেন সুধির নন্দী ওরফে সুধির নট্ট। যাকে শুধু বাউফলের মানুষ নয়, বরং গোটা পটুয়াখালীর অনেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথিত ‘পুত্র’ বলে চেনে।
কে এই সুধির নন্দী?
সুধির নন্দী বাউফল পৌর শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপাড়ায় বসবাস করেন। তার গ্রামের বাড়ি দাশপাড়া ইউনিয়নের দাশপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম সুখ রঞ্জন নট্ট এবং মায়ের নাম দীপালি নট্ট।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পরও তিনি এলাকায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং নির্বিঘ্নে রাতে নিজ বাসায় অবস্থান করেছেন। বাউফল থানার পূর্ব পাশে নুরিয়া মার্কেটে তার একটি জুতার দোকান রয়েছে, যেখানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করেছেন। ‘ডেভিল হান্ট’ নামের বিশেষ অভিযান শুরু হলে কিছুদিন আত্মগোপনে গেলেও পরে আবার প্রকাশ্যে ফিরে আসেন। গুঞ্জন রয়েছে, উপজেলা পর্যায়ের একাধিক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেই তিনি এলাকায় ফিরে এসেছেন।
শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়ার অভিযোগ
কথিত আছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাতের সুবাদে তিনি এক ধরনের ‘যাদুর কাঠি’ বা ‘আলাদিনের চেরাগ’ পেয়েছিলেন। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি রাতারাতি শূন্য থেকে কয়েক কোটি টাকার মালিক হন।
বিশেষ অনুসন্ধানে এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, শেখ হাসিনার ক্ষমতাকালে অনেক এমপি, মন্ত্রী, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ নানা কাজের জন্য সুধির নন্দীর কাছে ধর্ণা দিতেন। কথিত আছে, একসময় জীবিকার তাগিদে তিনি বাদাম বিক্রি করতেন। তার বাবা একসময় পান বিক্রি করতেন এবং মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন।
সুধির নট্ট বাদাম বিক্রির পাশাপাশি সিনেমা হলের মাইকিং করতেন। তার কণ্ঠস্বর ও সংলাপ বলার দক্ষতায় তিনি নজরে পড়েন স্থানীয় সাবেক এমপি আ. স. ম. ফিরোজের। পরে তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে মাইকিং করতে থাকেন।
একপর্যায়ে সাবেক এমপি ফিরোজের মাধ্যমে তার পরিচয় হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহকারী সাইফুজ্জামান শিখরের সঙ্গে। পরে সেই সূত্র ধরে তিনি একাধিকবার গণভবনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম সাক্ষাতেই তিনি শেখ হাসিনাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন এবং পরে স্ত্রী-সন্তানসহ একাধিকবার গণভবনে যান। প্রতিবারই তিনি মাছ, মুরগিসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতেন।
সূত্রমতে, সুধির নন্দী নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে শেখ হাসিনার সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করতেন। এসব ছবি ব্যবহার করে তার আত্মীয়-স্বজনও নানা সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
দুর্নীতির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের টানা শাসনামলে সুধির নন্দী ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেওয়া, থানার দালালি ও চাকরির তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইউএনও ও থানার ওসিরাও তাকে সমীহ করতেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
গ্রামের কাঁচা ঘর ভেঙে তিনি আধাপাকা ঘর নির্মাণ করেন। পরে পৌর শহরে জমি কিনে সেখানে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। স্থানীয়দের মতে, এসব সম্পত্তির মূল্য কোটি টাকারও বেশি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের নামে টাকা না রেখে নিকট আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাবে টাকা রাখতেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, পটুয়াখালী পৌরসভার সাবেক এক মেয়রকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার শর্তে বাউফলের চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে প্রায় তিন কোটি টাকার একটি ব্রিজের কাজ বাগিয়ে নেন তিনি। এছাড়া প্রভাব বিস্তার করে পৌর শহরের দাসপাড়ার একটি সার্বজনীন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদকের পদও দখল করেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে সুধির নন্দী বলেন, গ্রামের বাড়িটি তার বাবা করেছেন এবং শহরের জমি ও দ্বিতল ভবনের মালিক তিনি ও তার ছোট ভাই সুশীল। তিনি দাবি করেন, কোনো ঠিকাদারি কাজ, থানার দালালি বা চাকরির তদবির বাণিজ্য তিনি কখনো করেননি।
তিনি আরও বলেন, সিনেমা হলে মাইকিং করেছেন, তবে কখনো বাদাম বিক্রি করেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাকে ‘মা’ বলে সম্বোধনের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাবে টাকা রাখার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয়দের মতে, আওয়ামী লীগ আমলে রাতারাতি শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়ার ঘটনাটি অবিশ্বাস্য। তারা এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
No Comment Yet