বহুমাত্রিক শিল্পের বর্ণিল সাংস্কৃতিক উৎসব

আয়োজনটি সাজানো হয়েছে সংগীতকে আশ্রয় করে। রবীন্দ্র, নজরুল, লোকগানসহ ধ্রুপদী গানের সুরসুধায় সজ্জিত হয়েছে এই সংগীতাসর। বুধবার থেকে সূচনা হওয়া সংগীতায়োজনটি চলবে শনিবার পর্যন্ত। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি মিলনায়তনে বইবে সুরের মূর্ছনা। সেই সুবাদে বুধবার পৌষের শীতল সন্ধ্যায় গানে গানে সিক্ত হয়েছে সংগীতানুরাগীদের হৃদয়। অন্তরে বয়ে গেছে ভালোলাগার অনুভব। তবে কেবল সুরের ভুবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ‘প্রাণে আনো গান’ শীর্ষক চার দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব।

বহুমাত্রিক শিল্পের সংযোগে সেজেছে এ উৎসব। গানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দোলায়িত ছন্দের কবিতাপাঠের আসর। শুধু কি তাই! ৩৫ নারী চিত্রকরের চিত্রিত জীবনোপলব্ধির সাক্ষ্যবহ চিত্রকর্ম প্রদর্শনী আয়োজনে যুক্ত করেছে বর্ণিলতা। অন্যদিকে শিল্পালয়ের উঠোনে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বিপণি বিতানগুলোয় শোভা পাচ্ছে রকমারি নকশার শাড়ি, চাদর, শীতল পাটিসহ নিত্য দেশজ নানা পণ্য। নগরবাসীকে শিকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে সহজেই কাছে টানছে হস্তশিল্প ও কারুপণ্যের এই পসারা।

তাই তো গান, কবিতা কিংবা চিত্রকর্ম অবলোকনের সমান্তরালে সুবীর চৌধুরী চত্বরের মেলায় ভিড় জমাচ্ছেন আপন সংস্কৃতির অনুরাগী শহরবাসী। বিজয়ের মাস উদ্যাপনে ধানম-ির বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৈচিত্র্যের অনুসন্ধানী এই সাংস্কৃতিক  উৎসব। 
বাঙালির বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের স্মারক বিজয় মাসের স্মৃতি জাগানিয়া উৎসবটির আয়োজক ঢাকা ব্যাংক ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। 
বুধবার বিকেল গড়ানো শীতল সন্ধ্যায় উৎসব আঙিনায় স্মরণ করা হয় শহীদ ওসমান হাদি, দীপু চন্দ্র দাশ এবং অগ্নিদগ্ধ শিশু আয়েশাকে। শোক ও শ্রদ্ধার আবহে পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা। এর এই নীরবতা যেন বলে যায়Ñ সংস্কৃতি মানে শুধু বিনোদন নয়; একইসঙ্গে এটি প্রতিবাদ, সহমর্মিতা ও মানবিক চেতনার শিল্পিত প্রকাশ।
নীরবতা ভাঙতেই শুরু হয় সুর ও ছন্দোময় সরবতা। মঞ্চে আসেন কণ্ঠশিল্পী ও আবৃত্তিশিল্পীরা। অংশ নেন ‘দেশের গান ও দেশের কবিতা’ শীর্ষক পরিবেশনায়। সংগীত পরিবেশন করেন মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য, মানসী সাধু ও মাইনুর রহমান খান। তারা গেয়ে শোনান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘সেদিন আর কত দূরে’ ও ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর’সহ বেশ কিছু দেশাত্মবোধক সংগীত।

কবিতা আবৃত্তিতে অংশ নেন মহিউদ্দিন শামীম। শিল্পিত উচ্চারণে তিনি পাঠ করেন শামসুর রাহমানের কবিতা ‘তোমাকে পাবার জন্য হে স্বাধীনতা’, হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ এবং জীবনানন্দ দাশের ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’; যা শ্রোতা-দর্শকের মনে নতুন করে জাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনা ও বাঙালিত্বের আত্মপরিচয় বোধকে।
এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব উদ্বোধন করেন ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের এবং মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। উদ্বোধনী আলোচনায় বক্তারা বলেন, সংস্কৃতি ও সমাজ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই ধরনের আয়োজন জাতির সৃজনশীল চর্চাকে আরও শক্তিশালী করে। বিকশিত করে মানবিক বোধকে। ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ঘুচিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে গড়ে তোলে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আবহ।

বিজ্ঞাপন

Anjara World Shop

জাগ্রত রাখে মানবিক ও কল্যাণকামী স্বদেশ গড়ার আকাক্সক্ষাকে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘প্রাণে আনো গান’ শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; এটি সংগীত, কবিতা, শিল্প ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে অন্বেষণ ও উদ্যাপনের এক উন্মুক্ত পরিসর। বিজয়ের মাসে এই আয়োজন যেন স্মরণ করিয়ে দেয় সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই প্রাণ ফিরে পায় ইতিহাস; সেখান থেকেই জন্ম নেয় আগামীর স্বপ্ন।
আলোচনা শেষে পুনরায় মিলনায়তনে ছড়িয়ে পড়ে সুরেলা শব্দধ্বনি। বিটু কুমার শীল কণ্ঠে তুলে নেন কাজী নজরুল ইসলামের ভক্তিগীতি। তার পরিবেশিত ‘জে মঞ্জুল মঞ্জির’, ‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি’, ‘ হে গোবিন্দ রাখ চরণে’, ‘আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে’ গানের সুরবাণীতে ভক্তি ও মানবতার আবেশে আপ্লুত হয় শ্রোতার অন্তর।
সব শেষে বাউল ও লোকসংগীতের সম্মিলনে পরিবেশনা উপস্থাপন করেন খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়। শুরুতেই কণ্ঠে তুলে নেন চারণ কবি মুকুন্দ দাসের সেই বিখ্যাত গান ‘আয় দেখে যা জগৎবাসী বাংলাদেশ ঘুর’। এরপর শুনিয়েছেন ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে’, ‘বিষের বিষে চঞ্চলা মন’সহ একাধিক গান, যা শ্রোতাদের নিয়ে যায় বাংলার লোকজ আত্মার গহীনে। 
আজ বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের উৎসবের সংগীতাসর শুরু হবে সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায়। এদিন গান ঠুমরি শোনাবেন সুপ্রিয়া দাস। কিংবদন্তি কবি জসীম উদ্দীনের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ থেকে পাঠ করবেন বাচিকশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় গান পরিবেশন করবেন চম্পা বণিক। লোকগানের পরিবেশনায় অংশ নেবেন লাবিক কামাল গৌরব।
উৎসবের তৃতীয় দিন শুক্রবার তিন কবির গান পরিবেশন করবেন আজিজুর রহমান তুহিন। নজরুলের আধুনিক গান শোনাবেন সুস্মিতা দেবনাথ শুচি। পাঠে থাকবেন রায়হানুল আমিন কল্লোল এবং রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করবেন অদিতি মহসিন।
শেষ দিন শনিবার রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গান পরিবেশন করবেন মহুয়া মঞ্জরী সুনন্দা। জীবনমুখী গান শোনাবেন ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান। লোকগানের পরিবেশনা উৎসবের সমাপনী টানবেন টুনটুন বাউল।
সংগীত ও কবিতার পাশাপাশি উৎসবের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়েছে গ্রামীণ হস্তশিল্প ও কারুপণ্যের মেলা ‘কারুকথা’। আগামী ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১২টা থেকে সুবীর চৌধুরী চত্বরে উন্মুক্ত থাকবে এই মেলা। এর বাইরে নারীর জীবনোপলব্ধি ও শিল্পচর্চার অন্বেষণে ‘অন্যস্বর’ শীর্ষক দলীয় শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে ৩৫ জন নারী শিল্পীর নির্বাচিত শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে উৎসবে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও আবুল খায়েরের সংগ্রহ থেকে আহরিত শিল্পকর্মে সজ্জিত প্রদর্শনীটি চলবে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। কামরুল হাসান প্রদর্শনশালায় প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত ৮টা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এ প্রদর্শনী। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। এছাড়া উৎসবের অংশ হিসেবে ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোরদের জন্য কারুকর্মশালা ‘আকাশ-কুসুম’।

0%
0%
No Comment Yet