অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত করতে পারে

বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশে ভারত বিরোধী আবেগ উস্কে দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর একটি সাধারণ কৌশল। অন্যদিকে ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের মানুষের মনে বিরূপ ধারণা বাড়িয়ে দিতে পারে। 
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে সীমান্ত বিরোধ, পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং উভয়পক্ষে উস্কানিমূলক বক্তব্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রাসেলসভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়ে তাদের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এমন তথ্যই তুলে ধরেছে। ‘সোনালি অধ্যায় শেষে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আবার সঠিক পথে ফেরানো’ শীর্ষক ৫৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন মঙ্গলবার তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
আইসিজির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা ভারতের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। কারণ শেখ হাসিনা ছিল ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। নয়াদিল্লির সমর্থন হাসিনাকে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু দিন দিন অজনপ্রিয় হতে থাকা একজন শাসকের সঙ্গে ভারতের এই অতিঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে তীব্রতর করে। ফলে গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা যখন ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তখন ভারত বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে যায়। 
এরপর থেকে দুই দেশ সম্পর্ক ঠিক করার পরিবর্তে পারস্পরিক দোষারোপ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং অভিন্ন সীমান্ত উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ে বলে উঠে এসেছে আইসিজির প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, নয়াদিল্লি সম্ভবত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এখনই স্বাভাবিক করবে না; বরং তারা ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষায় আছে। 
আইসিজির মতে, এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে নয়াদিল্লিকে নির্বাচনের পর সদিচ্ছামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং যাদের সঙ্গে তাদের মতবিরোধ রয়েছে, এমন রাজনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রচারের সময় ভারত-বিরোধী বক্তব্য পরিহার করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে, তবুও সীমান্ত বিরোধ, নিরাপত্তা হুমকি এবং আধিপত্যবাদী আচরণের আশঙ্কায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রায়ই টানাপোড়েন দেখা দেয়। 
প্রতিবেদন মতে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিজয়ের পর নয়াদিল্লি দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সোনালী অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। পরবর্তীতে দুই দেশ স্থল ও সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে এবং শুল্ক হ্রাস, ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংহতি ত্বরান্বিত করে। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে শুরু করেন। তবে এ সময় বাংলাদেশে এমন একটি সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে ভারত সব সুবিধাজনক রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক চুক্তি হাসিল করে নিচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর বাংলাদেশে তার বিচারের দাবি থাকলেও ভারত তাকে আশ্রয় দেওয়ায় এই ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
আইসিজি বলেছে, হাসিনার দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর  থেকে নয়াদিল্লি ও ঢাকা একে অপরকে দোষারোপ করার বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েছে। উভয় পক্ষই দাবি করছে যে, তারা সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করেছে কিন্তু অন্য পক্ষ থেকে সাড়া পায়নি। একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কানির অভিযোগ তোলা হয়েছে। কখনো কখনো উভয় দেশ সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উত্তেজনা কোনো পক্ষের লাভ না করে বরং নেতিবাচক ধারণাকে আরও বাড়িয়েছে। 
 প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসিনার পতনের ধাক্কা ভারত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তাই মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। দেশটির নীতিনির্ধারকরা মূলত বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলের অপেক্ষায় আছেন। হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ না পাওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে ভারত ও বিএনপির সম্পর্ক সুখকর ছিল না। তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লির স্বার্থ রক্ষার জন্য বিএনপিই এখন ভালো বিকল্প হতে পারে।
আইসিজির মতে, উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী আবেগ উস্কে দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর একটি সাধারণ কৌশল। অন্যদিকে ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হিন্দু জাতীয়তাবাদ, আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং অবৈধ অভিবাসন বিষয়ে অতিসতর্কতা বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের প্রতি বিরূপ ধারণা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। 
আইসিজির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য অসম ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন এবং গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, এই বিষয়গুলো কেন্দ্র করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। যদিও দুই দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা বুঝতে পারছেন যে সুসম্পর্ক সবার জন্য উপকারী, তবুও তারা দীর্ঘস্থায়ী তিক্ততা ও অবিশ্বাসের বৃত্তে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কম থাকলেও, সম্পর্কের এই টানাপোড়েন সহিংস বিক্ষোভ, সাম্প্রদায়িক হামলা, সীমান্ত হত্যা এবং বিদ্রোহী তৎপরতার মতো অস্থিতিশীল পরিস্থিত তৈরি করতে পারে। 
 প্রতিবেদন মতে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী সহিংসতা এই ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দেয়। দেশটিতে ভারতের সমালোচক একজন ছাত্র (ওসমান হাদি) নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এই সহিংসতা। এ নেতার সংগঠন ভারতের সমালোচনা এবং আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আইসিজির মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারত মনে করেছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক কেবল আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার ওপর নির্ভরশীল, যা বাংলাদেশের রাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি করেছে। যদি বিএনপি পরবর্তী সরকার গঠন করে, তবে উভয়পক্ষের উচিত সম্পর্ককে একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগটি কাজে লাগানো। নয়াদিল্লিকে কেবল পরবর্তী সরকারের সঙ্গেই নয়, বরং বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বাড়াতে হবে। ভারত যৌক্তিকভাবেই তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে, তবে তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে উদ্যোগগুলো যেন পারস্পরিক লাভজনক হয় এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে আরোপিত ভিসা বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করার মাধ্যমে ভারতের উচিত একটি সদিচ্ছামূলক কার্যক্রমের পরিকল্পনা শুরু“ করা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আসন্ন নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ভারত-বিরোধী আবেগকে ব্যবহার না করা উচিত বলে মনে করে আইসিজি। তাদের মতে, এই ধরনের নির্বাচনী কৌশল ভারতে এই ধারণাকেই বদ্ধমূল করবে যে বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো ভারতের স্বার্থের পরিপন্থি, বিশেষ করে নিরাপত্তার প্রশ্নে। পরবর্তী সরকারকে ভারতের সদিচ্ছার ইতিবাচক সাড়া দিতে হবে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে এবং বিদ্রোহ ও চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। ভবিষ্যতে সম্পর্ককে সঠিক পথে এবং স্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে নিরসন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করে আইসিজি।

বিজ্ঞাপন
DBBL Deposit Plus Scheme (DPS) ; Interest Rate 2025

DBBL Deposit Plus Scheme (DPS) ; Interest Rate 2025

0%
0%
No Comment Yet