“সামাজিক সুরক্ষা ও প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে সমন্বিত জাতীয় নীতিমালার খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি কর্মশালা” অনুষ্ঠিত
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ সময়: ২৩:৪৯:১৪
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে “সামাজিক সুরক্ষা ও প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে সমন্বিত জাতীয় নীতিমালার খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি কর্মশালা” শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা আজ ২১ মে ২০২৬ তারিখে রাজধানীর বনশ্রী, রামপুরায় অবস্থিত নারী উন্নয়ন শক্তি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালার আয়োজন করে নারী উন্নয়ন শক্তি এবং সহযোগিতা করে ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট এন্ড রাইটস ও ফোরাম ফর কালচার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট।
অনুষ্ঠানে খসড়া জাতীয় নীতিমালা উপস্থাপন করেন ডঃ আফরোজা পারভীন, নির্বাহী পরিচালক, নারী উন্নয়ন শক্তি এবং কর্মশালার সমন্বয়ক। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু তাদের স্বাস্থ্য, মানসিক সুরক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের অবদানকে মূল্যায়ন করে একটি সমন্বিত, মানবিক ও টেকসই জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে অনেক প্রবীণ মানুষ একাকীত্ব, অবহেলা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক সংকটে জীবনযাপন করছেন। রাষ্ট্রকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে এটি বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, “যে সমাজ প্রবীণদের সম্মান দিতে জানে না, সে সমাজ কখনো মানবিক হতে পারে না। প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ গণপরিবহন, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।”
বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক ও নবীন-প্রবীণ আন্তঃপ্রজন্ম স্বনির্ভর ক্লাব, খিলগাঁ,ঢাকার সদস্য-সচিব মোঃ নাজিমুল আবেদীন বলেন, “চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রবীণ ব্যক্তিকে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পারিবারিক একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মেনে নিতে বাধ হয়। তাঁদের দক্ষতা,বিচক্ষণতা ও বনার্ঢ্য অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র চাইলে প্রবীণবান্ধব উৎপাদনশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারে।”
আকলিমা খাতুন বলেন, “প্রবীণ নারীরা দ্বিগুণ বৈষম্যের শিকার। পরিবার, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজন।”
ডঃ সুলতান মোহাম্মদ রাজ্জাক বলেন, “বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে হলে আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি, সংস্কৃতিচর্চা ও সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠন জরুরি।”
সেলিনা খাতুন বলেন, “তরুণ ও প্রবীণদের মধ্যে সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। এতে পরিবার ও সমাজে সহমর্মিতা বাড়বে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমবে।”
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা সরকারের কাছে প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে নিম্নোক্ত ১০ দফা সুপারিশমালা তুলে ধরেনঃ
১০ দফা সুপারিশমালা
১। প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সার্বজনীন ও পর্যাপ্ত বয়স্কভাতা চালু এবং ভাতার পরিমাণ জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
২। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রবীণবান্ধব বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, জেরিয়াট্রিক ইউনিট ও স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা সুবিধা চালু করা।
৩। একাকী ও অসহায় প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আবাসন, দিবাযত্ন কেন্দ্র ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র গঠন।
৪। গণপরিবহন, সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও জনসেবামূলক স্থাপনায় প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো ও অগ্রাধিকার সুবিধা নিশ্চিত করা।
৫। প্রবীণ নির্যাতন, সম্পত্তি দখল ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও আইনি সহায়তা সেল গঠন।
৬। প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান, পরামর্শক সেবা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি।
৭। ডিজিটাল সাক্ষরতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রবীণদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অনলাইন সেবায় সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
৮। আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিভিত্তিক সামাজিক কার্যক্রম চালু করা।
৯। প্রবীণ নারীদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ।
১০। প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করা এবং বাজেটে পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে যখন দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক জীবনযাপন করতে পারবেন। তারা প্রবীণদের বোঝা নয়, বরং অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান।
No Comment Yet