হামলা হলে পাল্টা জবাব হুঁশিয়ারি তেহরানের
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬ সময়: ১১:৩২:৩৮
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-সহিংসতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে রবিবার পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ সদস্যসহ ১৯২ জন নিহত হয়েছেন। বিক্ষোভ দমনে কঠোর ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ইরানে বিক্ষোভরত জনতাকে আল্লাহর শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেছে দেশটিতে ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকার। বিক্ষোভে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন, তাদের মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে ইরানে যে কোনো সময় হামলা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
এমন অবস্থায় তেহরান জানিয়েছে, ইরানে হামলা হলে পাল্টা জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এদিকে ইরানে চলমান তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং এর ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে একের পর এক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করছে বিশ্বের বিভিন্ন নামি বিমান সংস্থা। রবিবার লুফথানসা, ফ্লাইদুবাই, তুর্কিশ এয়ারলাইন্স, কাতার এয়ারওয়েজ এবং অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সের মতো বড় কোম্পানিগুলো ইরানে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সির।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী যদি ওয়াশিংটন ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালায় তাহলে উভয় দেশই তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে। ইরানে দেশব্যাপী চলমান বিক্ষোভে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান বাগাড়ম্বরের মধ্যে এই মন্তব্য দিল তেহরান। গালিবাফের বরাত দিয়ে ইরান ইন্টারন্যাশনাল টিভি চ্যানেল জানায়, আক্রমণ হলে ইসরাইল এবং মার্কিন সামরিক ও জাহাজ চলাচল কেন্দ্র উভয়ই আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।
ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে এমন আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরাইল। রবিবার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ইসরাইলি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ না করার বিষয়ে গেল কয়েকদিন ধরে ইরানকে বারবার সতর্ক করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত কয়েক বছরের মধ্যে সব থেকে বড় এই গণবিক্ষোভের পেছনে সন্ত্রাসীদের দায়ী করে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা রক্ষার শপথ নিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুতই রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা বর্তমানে দেশটিতে ধর্মীয় শাসনের অবসান দাবি করছেন। স্থানীয় সময় শনিবার রাত নামার পর রাজধানী তেহরানসহ উত্তরের রাশত, উত্তর-পশ্চিমে তাবরিজ এবং দক্ষিণের সিরাজ ও কেরমান শহরে নতুন করে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের সাদাতাবাদ এলাকায় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন, স্বৈরাচার নিপাত যাক এবং খামেনি নিপাত যাক। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে পরিস্থিতির ভয়াবহতা পুরোপুরি যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়লেও বিভিন্ন স্থান থেকে সহিংসতার খবর আসছে।
তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি সরকারি ভবনে আগুন দেওয়ার খবর জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। সিরাজ, কোম ও হামেদান শহরে নিহত নিরাপত্তা কর্মীদের জানাজার দৃশ্যও সম্প্রচার করা হয়েছে। বিক্ষোভের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ইরান এখন মুক্তির প্রতীক্ষায়। যা সম্ভবত আগে কখনও দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের জন্য প্রস্তুত আছে। ট্রাম্প গত শুক্রবার ইরানের নেতাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, আপনারা গুলি চালানো শুরু করবেন না। কারণ আমরাও তখন গুলি চালানো শুরু করব।
এদিকে ইরানের নির্বাসিত শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভি এক ভিডিও বার্তায় এই বিক্ষোভকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ৬৫ বছর বয়সী পাহলভি বলেন, আমাদের লক্ষ্য এখন আর শুধু রাস্তায় নামা নয়। লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করা এবং তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি দ্রুতই ইরানে ফেরার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। ইরানে বিক্ষোভকারীদের কঠোরভাবে দমন করায় দেশটিতে হামলার ব্যাপারে সিরিয়াসলি (গুরুত্বের সঙ্গে) ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস রবিবার জানিয়েছে, ইরানে কীভাবে হামলা করা যায় এ ব্যাপারে ট্রাম্পকে ব্রিফ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যদিও ট্রাম্প হামলার ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
তবে হামলার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন। সংবাদমাধ্যমটিকে নাম গোপন রাখার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানে কোথায় কিভাবে হামলা চালাতে পারে সে ব্যাপারে একাধিক পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেসামরিক স্থাপনার ওপর হামলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর আগে আরেক সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, ট্রাম্প যদি নির্দেশ দেন তাহলে ইরানের সেনাবাহিনীর অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক আকারে বিমান হামলা চালানো হতে পারে। ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিরাপত্তাবাহিনী। গত বৃহস্পতিবার রাতে সবচেয়ে তীব্র আন্দোলন হওয়ার পর শুক্রবার রাতেও রাস্তায় নেমেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়া শনিবারও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে।
তবে শুক্রবার রাতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচার গুলির ঘটনা ঘটেছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনটি হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালগুলো নিহত ও আহতে মানুষে উপচে পড়েছে। তেহরান হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন তরুণদের মাথা লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি ছোড়া হয়েছে। ইরানে চলমান বিক্ষোভে শতাধিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে তেহরান। রবিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ইসফাহান প্রদেশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে আইন প্রয়োগকারী কমান্ড স্পেশাল ইউনিটের কমান্ডার জানান, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা দমনের অভিযানে আটজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হন। অন্যদিকে আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, সারাদেশে বিক্ষোভে ১০৯ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। ইরানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া গত দুই সপ্তাহের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৯২ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চলমান এই সংঘাতে আহত হয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহম্মদ মোভাহেদি আজাদের দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবিধানের ১৮৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিক্ষোভকারীদের মোহারেব (আল্লাহর শত্রু) বলে ঘোষণা করছে ইসরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র।
বিজ্ঞাপন
Shwapno Super Shop
মোহারেবদের শাস্তি মৃত্যুদ-। ইরানের সংবিধানের ১৮৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো গোষ্ঠী কিংবা সংগঠন যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে— তাহলে ওই গোষ্ঠীর বা সংগঠনের সব সদস্যকে মোহারেব বা আল্লাহর শত্রু বলে ঘোষণা করে। ইরানের সংবিধানে আল্লাহর শত্রুদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদ-। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে।
ইরানে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিরাপত্তাবাহিনী। পুরো দেশজুড়েই বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে তাজা গুলি। রবিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে লন্ডন থেকে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল। সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ইন্টারনেট পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রেখে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-নিপীড়ন চলছে। এর মধ্যে দক্ষিণ তেহরানের কাহরিজাক থেকে পাঠানো একটি ভিডিওতে বেশ কয়েকজনের মরদেহ পড়া থাকা ও কয়েকজনের মরদেহ বডি ব্যাগে রাখা দেখতে পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সেখানে কয়েক ডজন মরদেহ আছে।
এ ছাড়া একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল শেডের কাছে আরও কয়েকজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এদিকে দুবাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী- শুধুমাত্র ফ্লাইদুবাইয়েরই তেহরান, সিরাজ ও মাশহাদগামী অন্তত ১৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একই পরিস্থিতি দেখা গেছে এমিরেটস এবং ওমান এয়ারের ক্ষেত্রেও। তুরস্কের জাতীয় বিমানসংস্থা তুর্কিশ এয়ারলাইন্সও দেশটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে তেহরান ও তাবরিজসহ বিভিন্ন রুটের ১৭টি ফ্লাইট স্থগিত করেছে। তাদের সহযোগী সংস্থা এ-জেটও একই পথ অনুসরণ করেছে।
মূলত গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে রিয়েলের অবমূল্যায়নকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরকার পরিবর্তনের এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, যা বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিমানসংস্থাগুলো জানিয়েছে যে তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের দাবি অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে শিশুসহ অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। স্থানীয় বার্তা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দাঙ্গার অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকশ’ মানুষকে আটক করা হয়েছে।
No Comment Yet