কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের ন্যায় সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি কুড়িগ্রামের বিশিষ্ট জনদের
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ সময়: ১৯:৫৬:১৬
কর্ম ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন কুড়িগ্রামের বিশিষ্টজনরা।
১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনে আত্মাহুতি দান করেছিলেন শ্রমিকরা। তাদের রক্তাক্ত স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৮৯০ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দুনিয়ার প্রতিটি দেশে মে মাসের ১ তারিখ নানা আয়োজনে পালন করা হচ্ছে শ্রমিক দিবস। বাংলাদেশও এই দিবসটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সকল পর্যায়ে মে দিবস এখন গুরুত্বসহকারে পালিত হচ্ছে। মে দিবস এলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে ঘর্মাক্ত মেহনতি মানুষের প্রতিচ্ছবি। আর এই মেহনতি মানুষের অধিকারের প্রশ্নটিও সাথে সাথে উঠে আসে এই ঐতিহাসিক দিনে।
সেকালে বামপন্থী সংগ্রামী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল শিকাগো। স্বভাবত এই শিকাগোতেই ১লা মে’র ধর্মঘট খুব সংগ্রামী চেহারা ধারণ করে। শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত এমন অনেকগুলো রাজনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে যথেষ্ট পরিষ্কার ধারণা না থাকলেও সে সময়কার আন্দোলন বাস্তবিক পক্ষে সংগ্রামী আন্দোলনই ছিল। শ্রমিকদের সংগ্রামের ময়দানে সামিল করতে জীবন ও জীবিকার অবস্থার আশু উন্নয়নের জন্য লড়াইয়ের মারফত তাদের সংগ্রামী চেতনা গড়ে তুলতে সে সময়কার আন্দোলন সর্বদাই প্রস্তুত ছিল। সংগ্রামী শ্রমিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতার ফলে শিকাগোর ধর্মঘট বিরাট আকার ধারণ করল। ধর্মঘট শুরু হবার অনেক আগেই ধর্মঘটের প্রস্তুতি চালাবার জন্য সেখানে একটি আট-ঘন্টা-শ্রম-সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অট-ঘন্টা-শ্রম-সমিতি ছিল একটি ঐক্যবদ্ধ মোর্চার প্রতীক। এই সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল ‘ফেডারেশন’, ‘নাইটস অব লেবর’ এবং আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম সংগঠিত সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ‘সোস্যালিস্ট লেবর পাটি’র অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়গুলো। সমস্ত বামপন্থী শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘সেন্ট্রাল লেবর ইউনিয়ন’। এই আট-ঘন্টা-শ্রম-সমিতিকে সমর্থন জানায়। ১লা মে’র ঠিক আগেকার রবিবারে ‘সেন্ট্রাল লেবর ইউনিয়ন’ একটি সমাবেশ সংগঠিত করে; ২৫০০০ শ্রমিক এই জমায়েত অংশগ্রহণ করেন।
আমেরিকার ফেডারেশন অব লেবার ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রথমবারের মতো প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজের দাবি তুললেন। তবে এতে তেমন কাজ হলো না। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি তো মানলই না, বরং তারা শক্ত অবস্থান নিলো। ফলে এক সময় শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরণের আকার ধারণ করল। আর সেটা ঘটল আজকের তথাকথিত মানবাধিকার ও সভ্যতার অহঙ্কারী দেশ আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে। কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ, মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধি ও কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরি করাসহ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ১৮৮৬ সালের পয়লা মে হে মার্কেটের শিল্পশ্রমিকেরা ধর্মঘটের ডাক দিলেন। এ ধর্মঘটে যোগ দেন প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক। তারা কলকারখানা বন্ধ রেখে নেমে এলেন রাজপথে।
শ্রমিকশ্রেণীর শত্রুরাও সে সময় নিস্ক্রিয় ছিল না। মালিক এবং শিকাগো সরকারের সম্মিলিত শক্তি সংগ্রামী নেতাদের ধ্বংস করে ফেলতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল; তারা ভেবেছিল এর ফলে শিকাগোর সমগ্র শ্রমিক আন্দোলনকে মারাত্মক আঘাত হানা সম্ভব হবে, বৃহত্তর ক্ষমতার বলে তারা শিকাগোর শ্রমিক অভিযানের গতি রোধ করে। এই ১লা মে তারিখের ঘটনারই প্রত্যক্ষ পরিণতি হলো ৩রা ও ৪ঠা মে তারিখের ঘটনাগুলো- হে মার্কেটের ঘটনা বলে যা পরিচিত। ৩রা মে তারিখের ‘ম্যাক-কর্মিকরিপার কারখানা’র ধর্মঘটরত শ্রমিকদের এক সভায় পুলিস জানোয়ারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ছ’জন শ্রমিককে হত্যা এবং অনেককে আহত করে। পুলিসের এই পাশবিক আক্রমণের প্রতিবাদে ৪ঠা মে হে মার্কেট স্কোয়ারে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল এবং সেদিনকার মতো স্থগিত হতে যাচ্ছিল, এমন সমায় সমবেত শ্রমিকদের উপর পুলিস আবার আক্রমণ করে, ভিড়ের মধ্যে একটি বোমা এসে পড়ে এবং তার আঘাতে একজন সার্জেন্ট নিহত হয়। সঙ্গে সঙ্গেই লড়াই শুরু হয়ে গেল: সে লড়াইয়ে মুত্যু হয় সাতজন পুলিসের আর চার জন শ্রমিকের।
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
এদিকে শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত করার অপরাধে শ্রমিক নেতা আগস্টসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। শুধু তাই নয়, অভিযুক্তদের প্রহসনমূলক বিচারের মুখোমুখি করে সরকার। তারপর ১৮৮৭ সালে সাজানো মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এর ফলস্বরূপ ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে আগস্ট স্পিজসহ ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামের এক শ্রমিক ফাঁসির আগের দিন কারাগারের ভেতর আত্মহত্যা করেন। আরেকজনের ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এত কিছুর পরও শ্রমিক আন্দোলন দাবিয়ে রাখা যায়নি। বরং সারা দুনিয়ায় শিকাগোর রক্তাক্ত ঘটনার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকায়ও এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানায় ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
No Comment Yet