মজুত বাড়াতে আরও ৫ লাখ টন জ্বালানি তেল কিনছে সরকার
প্রতিবেদক: অনলাইন ডেস্ক
সময়: শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬ সময়: ১৪:৫৪:১৬
॥ নাজিউর রহমান সোহেল ও ওবাইদুর রহমান ॥
ঢাকা, ৪ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেই জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়াতে আরও ৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল কিনছে সরকার। দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশে ৯০ দিনের মজুত সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আরও ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল (গ্যাস অয়েল) এবং ৯০ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি) রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড’ এই জ্বালানি সরবরাহ করবে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই জ্বালানি তেল ক্রয় করছে। সম্প্রতি বিপিসির এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি ও খনিজস্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, ‘সরকার সাধারণত প্রতি ছয় মাস পর পর দেশের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেল এবং জেট ফুয়েল আমদানি করে থাকে। এ কারণে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসের চাহিদার বিপরীতে বিপিসি একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরবর্তীতে সেটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কমিটি তা ইতোমধ্যেই অনুমোদন করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রশাসনিক ছাড়পত্র দিয়ে সেটি বিপিসির কাছে পাঠিয়েছি। এখন পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে বিপিসি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোয়া (নোটিফিকেশন অব এওয়ার্ড) দেবে। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু করবে।
বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে শুরু হওয়া ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার যখন চরম অস্থিতিশীল, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এক সাহসী ও দূরদর্শী উদ্যোগে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাকা সচল রাখা, শিল্পোৎপাদন ও কৃষিকাজ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং আকাশপথের যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখাকে বড় বিচেনায় নেওয়া হয়েছে।
বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বাসসকে বলেন, গত ১০ জুন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যার চিঠি ১৭ জুন পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘নোয়া’ ইস্যু করা হয়েছে। এখন চূড়ান্ত চুক্তির পর খুব দ্রুতই তেল সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে—যেকোনো মূল্যেই দেশে ৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত রাখতে হবে। বর্তমানে প্রায় ৬০ দিনের মজুত রয়েছে। চাহিদা মেটাতেই প্রতি ছয় মাস পর পর নিয়মিত তেল আমদানি করা হবে।’
আর্থিক ব্যয় ও ডলারের হিসাব :
বিজ্ঞাপন
Anjara World Shop
গত ২৪ মে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো বিপিসির এক প্রস্তাবে বলা হয়, জুন-আগস্ট সময়সীমার মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি করা হবে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দরপত্রে পরিমাণের কিছুটা কম-বেশি রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের গত ১৩ মে তারিখের ডলারের বিনিময় হার (১ ডলার সমান ১২৩.২৫ টাকা) অনুযায়ী এই আমদানিতে সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ কোটি ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬ মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং ডলারের মূল্যের পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত ব্যয় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। এই আমদানির টাকা বিপিসির নিজস্ব তহবিল এবং প্রয়োজনে ঋণ বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে মেটানো হবে বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছে।
উদ্বেগজনক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাজার পরিস্থিতি:
বৈশ্বিক উদ্বেগজনক প্রেক্ষাপট ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিপিসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেশি। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার অভাবে জাহাজগুলো দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করায় ট্রানজিট সময় ও পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া দাবি করছে।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি জটিল। ২০২২ সালে ডিজেলের সর্বোচ্চ দর প্রতি ব্যারেল ১৭৮.৯১ ডলার থাকলেও, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল তা রেকর্ড ২৮৪.৯৫ ডলারে পৌঁছায়। গত ফেব্রুয়ারিতে ডিজেলের গড় দর ৮৫.৯৯৭ ডলার থাকলেও এপ্রিলে তা ১১৮.৫০ শতাংশ বেড়ে ১৮৭.৯০৪ ডলার হয়।
বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে এবার প্রিমিয়াম কিছুটা বাড়লেও উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রাপ্ত এই দরটিকে বর্তমান বাস্তবতায় যৌক্তিক মনে করছে বিপিসির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি।
দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই :
জ্বালানি মজুত নিয়ে আশ্বস্ত করে জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। আগামী ৬০ দিনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ডলার সংকটের মধ্যেও এলসি খোলার ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই।
এ বিষয়ে যুগ্মসচিব মনির হোসেন বাসসকে বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইনে কোনো ধরনের বাঁধা বা সংকটের আশঙ্কা নেই।’
No Comment Yet