ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী’ মাইজভান্ডার’-ভক্তি, বিশ্বাস ও সুফি ঐতিহ্যের মিলনমেলা

উপজেলার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক’ মাইজভান্ডার’। ভক্তি, বিশ্বাস ও সুফি ঐতিহ্যের এক পরিচিত কেন্দ্র।

প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস, আধ্যাত্মিক সাধনা, ধর্মীয় সংগীত ও মানুষের গভীর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই জনপদের নাম। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান ঐতিহাসিক মাইজভান্ডারী সুফি ধারা আজও টানছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থীকে।

কারো কাছে মাইজভান্ডার আত্মিক প্রশান্তির ঠিকানা,আর কারো কাছে পারিবারিক বিশ্বাসের উত্তরাধিকার। আবার কারো কাছে এটি বাংলার সুফি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত অধ্যায়। বছরজুড়েই প্রতিদিন- প্রতিক্ষণ মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে মানুষের আগমন, জিকির-আসকার, ছেমা, মিলাদ, মোনাজাত,মৌরমী গান, ও সুফি সংগীতের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

মাইজভান্ডার ঘুরে এবং দরবারের খাদেমদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে মানুষের আগমনের উদ্দেশ্য এক নয়। কেউ ব্যক্তিগত সংকটের সময়ে প্রার্থনা করতে আসেন, কেউ পারিবারিক ঐতিহ্যের টানে, আবার কেউ মাইজভান্ডারী তরিকার ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আসেন।দরবার শরিফে জিয়ারত করতে আসা আবুল হাসেম নামের এক ভক্ত বলেন, “মাইজভান্ডার দরবারে এলে কলিজা ঠান্ডা হয়ে যায়। এখানে এলে মনে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করি।”

মাইজভান্ডার দরবারের ভক্ত ইদ্রিস মিয়াও একই কথা বলেন।তিনি বলেন, “জীবনের ছয় দশক ধরে এই দরবারের সঙ্গে যুক্ত আছি। মাইজভান্ডারের পরিচয় শুধু একটি দরবার কিংবা ভক্তদের সমাগমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে এখানকার সুফি ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই আধ্যাত্মিক ধারা ভক্তি, বিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধনে মানুষকে একত্র করছে।”

মাইজভান্ডার দরবারের ইতিহাস অনুযায়ী, মাইজভান্ডারী তরিকার প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত হজরত শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) ১৮২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০৬ সালে তার মৃত্যুর পরও অনুসারীদের মাধ্যমে তার আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ঐতিহ্যের চর্চা অব্যাহত রয়েছে।

ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার গ্রাম থেকেই এ সুফি ধারার পরিচিতি বিস্তার লাভ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে মাইজভাণ্ডার দরবারের লক্ষ লক্ষ অনুসারীর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক চর্চা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব।

বিজ্ঞাপন

Anjara World Shop

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাইজভান্ডারী ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় সাধনার সঙ্গে সংগীত ও মৌখিক ঐতিহ্যের সংযোগ। জিকির-আজকারের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক গান, ছেমা, ঢোল, তবলা ও হারমোনিয়ামের ব্যবহার এ ধারার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে। এসব গানে প্রেম, মানবিকতা, আত্মশুদ্ধি ও স্রষ্টার প্রতি নিবেদনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

ভক্ত-অনুরাগীদের মতে, মাইজভান্ডারকে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবে দেখলে এর বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিচয় পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবনযাপন, পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রজন্মান্তরে বহন করা বিশ্বাস। মাইজভান্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন বার্ষিক ওরশ। এ উপলক্ষে দরবারকেন্দ্রিক এলাকায় ভক্তদের সমাগম, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয় প্রতি বছর।

সংশ্লিষ্টদের মতে মাইজভাণ্ডার দরবারের ওরশ কেবল ধর্মীয় সমাবেশে সীমাবদ্ধ থাকেনি,স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ওরশকে কেন্দ্র করে ভক্তদের যাতায়াত, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটে। পাশাপাশি ভক্ত-অনুরাগীরা গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসেন, যা এ আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ। সব মিলিয়ে ওরশকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব কর্মকাণ্ড স্থানীয় জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

তবে মাইজভান্ডারী সুফি ঐতিহ্যকে ঘিরে গভীর ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতাও রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।তারা আরও জানান, পীরের প্রতি ভক্তি, দরবারকেন্দ্রিক কিছু আচার এবং সুফি অনুশীলনের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুসলিম সমাজের বিভিন্ন অংশে ভিন্নমত দেখা যায়।

এক পক্ষ মাইজভান্ডারকে আধ্যাত্মিক সাধনা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে, কেউ কেউ এর কিছু প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠানের ধর্মীয় ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফলে মাইজভান্ডারী ঐতিহ্যকে ঘিরে বিশ্বাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

0%
0%
No Comment Yet